বর্ষীয়সী এই অর্থনীতিবিদ এখনো থেমে নেই, কাজ নিয়েই মেতে আছেন— যা তাকে আরো বেশি করে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছে। এলিনর অস্ট্রম একজন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ। তার নামটা বিশেষভাবে স্মরণের কারণ হলো, তিনিই প্রথম এবং একমাত্র নারী অর্থনীতিবিদ যিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৯ সালে।

তিনি যৌথভাবে এই সম্মাননা পেয়েছিলেন আরেক অর্থনীতিবিদ অলিভার ই. উইলিয়ামসনের সাথে। এলিনর অস্ট্রম ও অলিভার উইলিয়ামসন তাদের গবেষণায় এটা দেখিয়েছেন যে, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সামাজিক সংস্থার বেশিরভাগ কাঠামো বিষয়ে ধারণা দিতে পারে, আলোকপাত করতে পারে। মালিকদের সংগঠন কীভাবে যৌথ সম্পত্তি পরিচালনা করতে পারে, অস্ট্রম তার পথ বাতলে দিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে সাধারণ স্তরে যে অর্থনৈতিক কাঠামো চালু রয়েছে, তার প্রশাসনিক দিকটিও তুলে ধরেছেন তিনি।

অর্থনৈতিক লেনদেন যে শুধু কোম্পানির স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা ও সাধারণ মানুষের সংসারেও ঘটে থাকে, অস্ট্রমের গবেষণায় তার স্বরূপ ফুটে উঠেছে। ফলে মানব সমাজ সামগ্রিকভাবে যে প্রক্রিয়ায় সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে থাকে, তার একটা সার্বিক চিত্র উঠে এসেছে। চিরায়ত অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী এতদিন দাবি করা হতো যে, মাঠ-ঘাট, জঙ্গল বা মেস্যর মত প্রাকৃতিক সম্পদের কোন স্পষ্ট মালিক না থাকার ফলে এই ধরনের সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত উপযোগ হয়ে থাকে। ফলে কর চাপিয়ে বা আইন প্রণয়ন করে ঐ ধরনের সম্পদের ব্যবহার সীমিত করে দিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দেয়া হতো। অস্ট্রম বলছেন, যেসব ক্ষেত্রে বাজারের নিয়ম কাজ করছে না, সেসব ক্ষেত্রে মানুষ ঠিকই এমন কোন সমাধান খুঁজে নেয়, যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ না হয়ে যায়। যেমন: মঙ্গোলিয়া এবং চীনের সংলগ্ন অঞ্চলে বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে পশুপালকরা ঐতিহ্য অনুযায়ী ছোট ছোট গোষ্ঠিতে বিভক্ত হয়ে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ঐ জমি ব্যবহার করে এসেছে। অথচ সেক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু রাশিয়া ও চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সমবায় এবং পরে ব্যক্তিগত মালিকানার আওতায় যে জমি ব্যবহার করা হয়েছে, তার অবস্থার অনেক অবনতি ঘটেছে। আমেরিকান বংশোদ্ভূত এলিনরের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৭ আগস্ট। বিভারলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

ইউসিএলএ থেকে ১৯৫৪ সালে স্নাতক এবং ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। এলিনর সবসময় প্রথাগত অর্থনীতির বিপরীত দিকটি নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন। বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গবেষণার জন্যই তিনি ২০০৯ সালে জিতে নেন অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার। এলিনর ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় ও এরিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এছাড়াও তিনি অনেকগুলো আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের সাথে জড়িত। সাধারণ মানুষের জন্য উপকারী বিকল্প অর্থনৈতিক ধারা ও পদ্ধতি নিয়েই তার মূল কাজ।

নানাবিধ গবেষণার দ্বারা তিনি অর্থনীতি নিয়ে তার এ চিন্তাধারা নিয়ে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলতে পেরেছেন। তার কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেক, নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি প্রথম নারী হিসেবে ‘জোহান স্কিট প্রাইজ ইন পলিটিক্যাল সায়েন্স’ এবং ‘উইলিয়াম এইচ রিকার প্রাইজ ইন পলিটিক্যাল সায়েন্স’ পেয়েছেন। আরো ছোট-বড় অগুনতি পুরস্কার ও সম্মাননা তো আছেই তার ঝুলিতে। গুণী এই অর্থনীতিবিদকে মূল্য দিতে ভোলেনি টাইম সাময়িকীও, ২০১২ সালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় রয়েছে এলিনর অস্ট্রমের নাম। বিজ্ঞানী মেরি কুরি নিজ যোগ্যতা দিয়ে দু’টি নোবেল (রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায়) অর্জন করে নারীদের সম্ভাবনাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, কিন্তু তার পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথে হেঁটে নোবেল কমিটির নজরে পড়েছেন কম সংখ্যক নারীই। অস্ট্রমের সময়ে ও তার আগে অর্থনীতি নিয়ে কাজ করে অনেক নারী অর্থনীতিবিদই খ্যাতি কুড়িয়েছেন, তবে তার পরিমাণ পুরুষ অর্থনীতিবিদদের তুলনায় বেশ কম ছিল। এলিনর অস্ট্রমের এই কাজ করে যাওয়া এবং একের পর এক স্বীকৃতি অর্জন নারীদেরকে নিঃসন্দেহে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে এবং করছে অর্থনীতির মত বিষয় নিয়ে কাজ করতে, বিশেষ করে প্রচলিত ধারার বাইরে চিন্তা করতে। বর্ষীয়সী এই অর্থনীতিবিদ এখনো থেমে নেই, কাজ নিয়েই মেতে আছেন— যা তাকে আরো বেশি করে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছে।

অনলাইন ডেস্ক