(১) টরন্টো শহরের প্রতি কিলোমিটারে কমপক্ষে ৩ টা দোকান আছে - যার সাইবোর্ড গুলোতে ডলারের চিহ্ন লাগানো। এইগুলোক বলা হয় - পে ডে লোন। যাদের কোন কো ল্যাটারাল নেই - মোট কথায় তাদের ক্রেডিট নেই - বা বন্ধক দেবার মতো কোন কিছু নেই তাদের জন্যে ঋন দেয় এই দোকানগুলো।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে উচ্চহারে সুদের এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যা অত্যান্ত দরিদ্র মানুষরা যারা ক্ষেত্রবিশেষ একশ ডলারের বিপরিতে ২০০ থেকে আড়াইশ ডলার পরিশোধ করে। কানাডায় এই ঋণের লেনদেশের পরিমান ২ বিলিয়ন ডলার প্রতিবছর। প্রান্তিক মানুষের উপর চেপে বসা এই মহাজনী পদ্ধতির এক বিরাট প্রদর্শনী দেখছি উন্নত দেশেও।

(২) সিডরের পর একটা টিভির খবরে দেখাচ্ছিলো - ঘরে পানি ঢুকে আছে - কোন ভাবে একটা পরিবার নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে ঘরের ভিতরে চকির উপর - সেখানে এক মাইক্রোক্রডিট পাওনাদার বগলে একটা ব্যাগ নিয়ে ঘরের মালিককে ডাকছে - কারন তাদের সাপ্তাহিক পাওনা বাকী পড়ে আছে। টিভির ক্যামেরা দেখে লোকটা দ্রুত পালিয়ে গেলো। প্রশ্ন হলো - কেন লোকটা পালালো? কারন সে জানে সে যা করছে তা অন্যায়। এই রকমের অন্যায়ের সাথে জড়িত বাংলাদেশের কতগুলো প্রতিষ্ঠান? কত মানুষ এই নব্য মহাজনদের নাগপাশে আবদ্ধ?

(৩) আজকের খবরে দেখলাম - সাপ্তাহিক পাওনা না পেয়ে একটা ছোট মেয়েকে ধরে নিয়ে গেছে একটা :"মাইক্রো ক্রেডিট" প্রতিষ্টান আর তারা দাবী করেছে পাওনা না দিলে এই শিশুকে তারা ছেড়ে দেবে না। পরিস্থিতি কতটা গভীরে চলে গেছে যে একটা শিশু কন্যাও এখন বন্ধকের মতো পন্য বিবেচনা করছে মাইক্রোক্রডিট মালিকরা!

(৪) বাংলাদেশের অনেকেরই গর্ব হয় - বাংলাদেশে মাইক্রোক্রডিটের জনক নোবেল পেয়ে বাংলাদেশকে সন্মানিত করেছে। অবশ্য বিষয়ট লক্ষ্য করার মতোই - কিন্তু প্রকৃত পক্ষে মহাজনী পদ্ধতি একটা অত্যান্ত পুরোনো একটা পদ্ধতি - যা সেকসপিয়ারে মার্চেন্ট অব ভেনিসেও দেখি। উপরে প্রথম তথ্যটাও এই কথা প্রমান করে। তবে গ্রামীন ব্যাংক বাংলাদেশে মাইক্রোক্রেডিট নামে মহাজনী প্রথারই পুনপ্রবর্তন করেছে সাফল্যজনক ভাবে - যার বিস্তার হয়েছে ব্রাক, প্রশিকা থেকে শুরু করে অনেক ছোট বড় প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমে।

সমস্যা হলো - মাইক্রোক্রেডিটের নোবেল বিজয় বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষদের একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে। সরকার মুলত মাইক্রোক্রেডিটের কাছে জিম্মি - বিশেষ করে মাইক্রোক্রডিটের জনকের বিশাল প্রভাব সরকারের পক্ষে মাইক্রোক্রেডিটের ব্যবসাকে একটা আইনী কাঠামো নিয়ে আসার কাজটাকে কঠিন করে ফেলেছে। ফলাফল হিসাবে দেখছি বেপোরোয়া ভাবে নানান প্রতিষ্ঠান সাধারন মানুষের উপর চেপে বসেছে মহাজনের মতো। আজ তাই দেখছি ছোট একটা মেয়ে শিশুকে জিম্মি করতেও দ্বিধান্বিত নয়।

একটা দেশের আইনী কাঠামোর মধ্যে কেউই আইনের উদ্ধে থাকতে পারে না - তা সে যত বড় পুরস্কারে অধিকারীই হোক না কেন। সরকারে দ্রুত মাইক্রোত্রডিটের আড়ালে মহাজনী ব্যবসাকে একটা আইনী কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা জরুরী এবং দেশের প্রান্তিক দরিদ্র শ্রেনীই যেহেতু এই মাইক্রোক্রডিট ব্যবসার টার্গেট গ্রুপ - তাদের পক্ষে কথা বলার মতো কোন প্রতিষ্ঠানই নেই দেশে - না সুশীল সমাজ - না রাজনীতিকরা - না মিডিয়ার মালিকরা ( এরা সবাই উচ্চশ্রেনী মানুষ - যারা মাইক্রোক্রেডিট মালিকদের একই গোত্রভুক্ত) এই দরিদ্র শ্রেনী পক্ষে কথা বলবে - একমাত্র সরকারই পারে এদের সুরক্ষার জন্যে আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরী করতে - এবং অবশ্যই সরকারকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অনলাইন ডেস্ক