আশুরা বিপ্লব-১: হিজরী ৬০ সালের কথা৷ কয়েক দিন মাত্র অতিক্রান্ত হয়েছে, এজিদ তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে৷ মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজসিংহাসন ঘিরে চলছে আনন্দ ফুর্তি এবং উত্স্বের সমারোহ৷ কিন্তু এজিদের চোখে মুখে চিন্তার ছায়া, দৃষ্টির গভীরে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগের নিশানা মাঝে মধ্যেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের প্রচ্ছন্ন চাঁদের মত প্রকাশিত হচ্ছে৷

প্রয়াত বাবার সতর্কবাণী ঘন ঘন তাকে আঘাত করে চলেছে৷ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আমিরে মুয়াবিয়া এজিদকে চারজন ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছিলেন, এদের মধ্যে তিনজনকে তুমি ছলচাতুরী, লোভ কিংবা হুমকি দিয়ে বাগে আনতে সক্ষম হলেও হোসাইন বিন আলীকে তুমি তা পারবে না কারণ হোসাইন প্রতিপালিত হয়েছে এক পবিত্র পরিবেশে, স্বয়ং বিশ্বনবীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে৷ অপরদিকে মদিনা শরীফের প্রশাসক ওলিদ তার খাস কামরায় বসে নানা চিন্তায় মশগুল ছিল৷ এমন সময় কাসেদ এসে এজিদের একখানি পত্র ওলিদের কাছে হস্তান্তর করলো৷ তাতে লিখা ছিল, ‘এজিদ ইবনে মোয়াবিয়ার পক্ষ থেকে মদিনার প্রশাসক ওলিদ ইবনে ওতবার প্রতি.........৷ আপনাকে অবহিত করা হচ্ছে যে, আমিরে মুয়াবিয়া ইহধাম ত্যাগ করেছেন এবং মৃত্যুর পূর্বে তিনি আমাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেছেন৷ আপনার প্রথম কাজ হচ্ছে প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে হলেও মদিনার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিশেষ করে হোসাইন বিন ‍আলীর আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে৷ নির্দেশ পাবার পর মদীনার শাসক ওলীদ ইবনে ওতবা ইমামকে তার গৃহে দাওয়াত করে যখন মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর এবং এজিদের চিঠির প্রসঙ্গ টেনে বললো তার আনুগত্য স্বীকার করে নিতে,তখন ইমাম বলেছিলেন যে 'তুমি তো নিশ্চয়ই চাও যে আমি গোপনে নয় বরং সর্বসমক্ষে তার বাইয়াত গ্রহণ করি ?' ওলিদ বেশ আনন্দের সাথে বলেছিল-'হ্যাঁ,ঠিক তাই'৷ ইমাম হোসাইন (আ) তখন বলেছিলেন,'তাহলে কাল আমি লোকজন নিয়ে তোমার কাছে আসি৷' একথা শুনে নবী পরিবারের প্রকাশ্য শত্রু মারওয়ান ইবনে হাকাম হাঁক মেরে বললো 'হে ওলীদ! হোসাইনকে যেতে দিও না৷ তাহলে তার আর নাগাল পাবে না৷ এখানেই তার শিরোচ্ছেদ করো৷' হোসাইন (আ) বললেন, 'কাকে তুমি ভয় দেখাচ্ছো৷ নবী পরিবারের কেউই কোনোদিন ‍এজিদের মতো একজন ফাসেকের বাইয়াত গ্রহণ করতে পারে না৷ একথাটাই কাল সকালে জনগণের সামনে পুনরাবৃত্তি করতে চাই আমি৷' এই বলে শান্ত চিত্তে তিনি ওলীদের ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ৷ 

সুনসান নিরব নিস্তব্ধ রাতে ইমাম হোসাইন (আ) গেলেন পূত-পবিত্র একটি জায়গায়৷ জায়গাটি আর কিছু নয়, তাঁরই প্রিয় নানা রাসূলে খোদা (সা) এর মাযার৷ বিনীত শ্রদ্ধাময় প্রশান্ত অনুভূতি নিয়ে তিনি বিড়বিড় করে বলছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সা)! আমি তোমার প্রিয়তম কন্যা ফাতেমা (সা) র সন্তান হোসাইন৷ একজন অত্যাচারী বর্তমানে চাচ্ছে আমি যেন তার বাইয়াত গ্রহণ করি৷ কিন্তু এ কাজ আমি কক্ষনোই করবো না.........৷ কারণ এ কাজ তোমার সম্মান ও মর্যাদার সম্পূর্ণ বিরোধী৷' ইমাম ফজরের নামায রাসূলে খোদার পবিত্র মাযারের পাশেই আদায় করলেন৷ ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে উঠলো মদীনা৷ মদীনার সূর্যালোক হোসাইনের জন্যে ব্যাপক স্মৃতিবহ৷ তাঁর মনে পড়ে যায়, নবীজী (সা) তাঁকে এবং তাঁর ভাই হাসানকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে যেতেন এবং মিম্বারে বসে তিনি বলতেনঃ ' হাসান এবং হোসাইন হলো বেহেশতে যুবকদের সর্দার৷' সেই মদীনার দিকে ইমাম হোসাইন তাঁর শেষ দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন৷ দিনটি ছিল হিজরী ৬০ সালের রজব মাসের আটাশ তারিখ৷ ইমাম হোসাইন (আ) তাঁর স্বজন-পরিজনদের সঙ্গে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালেন৷ রওনাকালে তিনি তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানিফার উদ্দেশ্যে একটি অসিয়্যতনামা লিখলেন৷ ঐ অসিয়্যতনামায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর রাসূলের প্রতি দরুদ পাঠানোর পর লিখেছেনঃ 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম৷ এটি হোসাইন ইবনে আলীর অসিয়্যত৷

আমি এখন মদীনা ছেড়ে যাচ্ছি৷ আমার এই মদীনা ত্যাগ শান্তির অন্বেষায় নয়, না কোনো ভয়-ভীতির কারণে৷ বরং আমার এই সফরের উদ্দেশ্য হলো আমার নানাজী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর দ্বীনের সংস্কার করা৷ আমি যেখানেই থাকি না কেন, জনগণকে সত্যের পথে ন্যায়ের পথে আসতে অনুপ্রাণিত করবো এবং অন্যায় ও অসত্‍ পথে ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবো৷' মক্কায় ইমাম হোসাইন (আ) এর সপরিবার আগমন-বার্তা প্রচার হয়ে গেল৷ মক্কাসহ বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানরা ইমামকে আরেকবার দেখার জন্যে ছুটে আসতে লাগলো৷ ইমামের পবিত্র চেহারা ছিল নানা নবীজীর চেহারার মতো আর বক্তব্যও ছিল তাঁরই মতো৷

তাই ইমামকে দেখলে কিংবা তাঁর বক্তব্য শুনলে রাসূলের (সা) কথা, রাসূলে খোদার চেহারা সবার কল্পনায় ভেসে উঠতো৷ ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণে ইমামের অস্বীকৃতির খবর জনগণকে তাঁর প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট করেছিল৷ বিশেষ করে ইয়াযিদের শাসন স্বেরাচারী শাসন, তার শাসনের সাথে আল্লাহর আইনের কোনো সম্পর্ক নেই-এই মর্মে তাঁর কাছে কুফা থেকে অসংখ্য চিঠি এবং বার্তাবাহক আসতে শুরু করলো৷ কুফার লোকজন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি সোলায়মান ইবনে সারাদ এর বাসায় এসে সমবেত হয় এবং সোলায়মান তাদের কাছ থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি আদায় করে যে,তারা হোসাইন ইবনে আলীর সহযোগিতায় বিশ্বস্ততার পরিচয় দেবে৷ সবাই একবাক্যে স্বীকার করলোঃ 'ইমামের সন্তান ইমাম হোসাইন ইবনে আলীকে সার্বিক সহযোগিতা করবো৷' ইমাম প্রথম প্রথম এইসব চিঠির কোনো উত্তর দিচ্ছিলেন না৷ কিন্তু চিঠির সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছে গেল৷ জনগণ ইয়াযিদের অত্যাচার আর কপটতার ব্যাপারে তাঁর কাছে অভিযোগ করতে লাগলো৷ তাই তিনি শেষপর্যন্ত ভাবলেন যে জনগণকে সাহায্য করার ব্যাপারে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে৷

এই কর্তব্য বোধ করেই তিনি প্রথমে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্যে তাঁর দূত হিসেবে মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় পাঠালেন৷ সে সময় কুফায় আঠারো হাজার মানুষ মুসলিমের আনুগত্য স্বীকার করে৷ কিন্তু ইয়াযিদ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে রক্তপিপাসু ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে কুফার শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়৷ তার নিয়োগের ফলে কুফায় থমথমে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়৷ শহরের পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়৷ কুফার প্রতিশ্রুত অধিবাসীরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হোসাইন (আ) এর দূত মুসলিমকে একাকী রেখে চলে যায়৷ অবশেষে মুসলিম শহীদ হন৷

আশুরা বিপ্লব-২: ইমাম হোসাইন (আ) হজ্জের রীতি অনেকটা অসমাপ্ত রেখেই আল্লাহর বিধান পালনের উদ্দেশ্যে নিজেকে প্রস্তুত করলেন৷ যেন এক ভিন্নরূপী সকাল, তুফানের আগে ভয়াল নিস্তব্ধতা৷ কুফার পথে ইমাম স্থানে স্থানে মানুষকে উদ্দেশ্য করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিতে থাকেন৷ তার এসব বক্তব্যের মর্মকথা হলো, হে লোক সকল; নবী করিম (দ:) বলেছেন, যে অত্যাচারী শাসক হারামকে হালাল মনে করে, রাসুলের সুন্নাতের পরিপন্থী কাজ করে এবং নিরপরাধ মানুষকে উত্যক্ত করে, তাকে চিনবার পরও যদি মুসলমানরা প্রতিবাদী না হয় এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয় তাহলে জেনে রাখো অত্যন্ত কঠোর পরিণতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে৷ জোহাইর বিন কিস্ ইমামকে উদ্দেশ্যে করে বলে উঠলেন, হে নবীজির বংশধর, আপনার সহযাত্রীরা তাদের নিজের জীবনের চেয়ে আপনার সান্নিধ্যকে প্রাধান্য দেয়৷ এ সময় দূর থেকে অশ্বারোহী একটি দলকে আসতে দেখা যায়৷ অশ্বারোহী দলটি ইমামের কাছে এসে সালাম নিবেদন করলো৷ ইমাম কুফার অবস্থা জানতে চাইলেন৷ আগন্তক কাফেলা ইমামকে জনালেন, কুফার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অর্থ - সম্পদের বিনিময়ে এজিদের পক্ষে চলে গেছে৷ তারা এখন আপনার বিরুদ্ধে তত্পের হয়েছে৷ আগন্তকদের আরেকজন বলে উঠলো, সাধারন মানুষ মন থেকে আপনাকে ভালোবাসলেও আগামীকাল তারাই আপনার বিরুদ্ধে তরবারী চালনা করবে৷ ইমাম হোসাইন তখন তার প্রতিনিধি কেইসের সম্পর্কে জানতে চান৷

আগন্তক কাফেলা ইমামকে জানাল, কুফার শাসনকর্তা ইবনে যিয়াদের লোকেরা কেইসকে গ্রেফতার করে,এরপর ইবনে যিয়াদ কেইসকে আপনার ও আমিরুল মুমেনীন হযরত আলীর প্রতি অভিসম্পাত করার জন্য চাপ দেয়৷ কিন্তু ঈমানের আলোয় দীপ্তমান কেইস আহলে বাইতের প্রশংসা করতে শুরু করে৷ এই অপরাধে নরাধম ইবনে যিয়াদের নির্দেশে কেইসকে প্রাসাদের ছাদ থেকে নিক্ষেপ করা হয়৷ ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন৷ পথিমধ্যে কুফার মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা এবং সেখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানবার পর ইমাম হোসাইন (আ:) এর সঙ্গীদের অনেকেই আর অগ্রসর না হয়ে, ইমামকে ফিরে যাবার জন্য পরামর্শ দেন৷ তারা ইমামকে বলেন, এটা এখন নিশ্চিত যে কুফার মানুষ আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসবে না৷

কিন্তু আগন্তক কাফেলার কাছ থেকে সবকিছু জানার পর ইমাম যেন আরো প্রত্যয়ী হয়ে উঠলেন৷ তিনি তার প্রতিনিধি এবং দূতদের অবস্থান সুস্পষ্ট করার জন্য সুরায়ে আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করলেন৷ "ঈমানদার বিশ্বাসীদের মধ্যে অনেকে আল্লাহর সাথে তাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে৷ ওদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছে এবং অনেকে প্রতীক্ষায় রয়েছে৷ তারা তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করেনি৷" ইমাম তার সঙ্গীদেরকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিলেন, ইসলামের এই ক্রান্তিকালে মহা আদর্শ স্থাপন করা ইমাম ছাড়া আর কার পক্ষে সম্ভব ছিল ? তাই ইমাম সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্যে, বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির বেড়াজাল থেকে মুহাম্মাদী ইসলাম রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজ করণীয় সাব্যস্ত করে ফেললেন৷ ইমামের নির্দেশ পেয়ে তার সহযাত্রী দল, ঘোড়া গুলোকে পানি পান করালেন এবং কারবালা প্রান্তরের উদ্দেশ্যে যাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন৷ ইমাম হোসাইন (আ:) ও তার সঙ্গীদের কাফেলা উষর মরু প্রান্তর দিয়ে এগিয়ে চলেছে৷ কোথাও কোন শব্দ নেই; হটাত্‍, কাফেলার মধ্র থেকে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে সকলের মনোযোগ আকৃষ্ট হলো৷

একজন বলে উঠলেন, হে ইমাম,দূরে খেঁজুরের বাগান দেখা যাচ্ছে৷ এখানে এর আগে কখনো তো খেঁজুরের বাগান ছিল না! কাফেলার অন্যরাও তখন মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করার চেষ্টা করলো৷ না, কোন খেঁজুরের বাগান নয়, দেখে মনে হচ্ছে বর্ম সজ্জিত একদল ঘোড়সাওয়ার বাহিনী আমাদের দিকে ছুটে আসছে৷ আস্তে আস্তে অশ্বারোহী সেনাদলটি ইমামের কাফেলার সামনে এসে উপস্থিত হলো৷ দলপতি নিজেদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানি প্রার্থনা করলে ইমাম তাদেরকে পর্যাপ্ত পানি দেয়ার জন্য তার সঙ্গীদেরকে নির্দেশ দিলেন৷ এরপর ইমামের এক সঙ্গী আগন্তক দলপতিকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে, তিনি নিজেকে হুর ইবনে ইয়াজিদ রিয়াহী বলে পরিচয় দেন৷ ইমাম হুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি আমাদের পক্ষে না বিপক্ষে? জবাবে হুর বললেন, আমি আপনার যাত্রায় বাধা দেয়ার জন্য আদিষ্ট হয়ে এখানে এসেছি৷

ইমাম হুরের বাহিনীর প্রতি ভালো করে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলেন এরা কুফার অধিবাসী৷ তাই তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, তোমরাই না আমাকে হাজার হাজার চিঠি দিয়ে আমাকে কুফায় আসার জন্য আমন্ত্রন জানিয়েছিলে ? এরই মধ্যে ইমামের একজন সঙ্গী নামাজের জন্য আযান দেন৷ দুপক্ষই ইমামের ইমামতিতে নামাজ আদায় করেন৷ নামাজ শেষ হওয়ার পর ইমাম পুনরায় হুরকে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন৷ হুর পুনরায় একই উত্তর প্রদান করে৷ ইমাম হোসাইন (আ:) পুনরায় হুর এবং তার বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমরাই না আমাকে সাহায্যের জন্য বার বার অনুরোধ করেছিলে, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এখানে এসেছি আর তোমরা উল্টো এখন আল্লাহর নবীর বংশধরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছ ? আমরা অপমান ও অমর্যাদাকে কখনই মেনে নেব না৷ আল্লাহ ও তার রাসুলের এটাই শিক্ষা৷ মুমেন মুসলমানরা সব সময় সম্মান রক্ষার জন্য মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করবে৷ হুরের বাহিনী ইমামের কাফেলার পাশাপাশি অগ্রসর হতে থাকে৷ এক পর্যায়ে ইমামের বিভিন্ন ভাষণ হুরের অন্তরে ঝড়ের সৃষ্টি করে৷ দলপতি হুরের অন্তরে আমূল পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট হতে শুরু করে৷

আশুরা বিপ্লব-৩: মরুর বুকে ঘোড়াগুলো দৌড়াচ্ছে৷ আকাশজুড়ে কালোমেঘের আনাগোনা৷ কারবালার বুকে এতো জনসমাগম বোধ হয় আর কখনো হয় নি৷ দিনের প্রতিটি প্রহরেই নতুন নতুন সেনা এসে জড়ো হচ্ছে৷ উমন ইবনে সাদ আবি ওক্কাসের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে হোসাইন (আ) কে বাইয়াত গ্রহণ করতে বলে৷ এর কয়েক ঘণ্টা পর শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদির নেতৃত্বে আরো বহু নতুন সৈন্য এসে তার সাথে যোগ দেয়৷ লৌহবর্ম পরিহিত অবস্থায় শিমার ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলো৷ তার চোখেমুখে নির্দয়-নির্মমতার ছাপ৷ অহঙ্কারের সাথে সে কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে যেয়াদের একটি চিঠি ওমরের হাতে দেয়৷ ঐ চিঠিতে লেখা ছিলঃ 'হে সাআদের পুত্র! হোসাইনের সাথে নম্র ব্যবহার করার জন্যে তোমাকে পাঠাই নি৷ হোসাইন যদি আত্মসমর্পন না করে, তার ওপর এবং তার সঙ্গী- সাথীদের ওপর হামলা করবে৷

সবাইকে হত্যা করে তাদের লাশের ওপর দিয়ে ঘোড়া চালাবে৷ এ কাজের জন্যে তুমি আমার কাছ থেকে উত্তম পুরস্কার পাবে৷ আর যদি তুমি এ দায়িত্ব পালন করতে না পারো, তাহলে সেনাপতির দায়িত্ব শিমারকে দেবে৷' চিঠি পড়ে ওমর সাআদ শিমারের দিকে তাকিয়ে বললোঃ' তোর ওপরে খোদার লা'নত৷ তুই একটা প্রতারক৷' বলতে না বলতেই শিমার হুঙ্কার মেরে বললো যে ইয়াযিদের আদেশ পালন না করা পর্যন্ত সে শান্ত হবে না৷ অবশেষে মুহররমের ষষ্ঠ দিনে বিশ সহস্রাধিক সশস্ত্র সৈন্যকে রাসূলে খোদা (সা) এর সন্তানের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে কারবালায় প্রেরণ করা হলো৷ কারবালা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেল৷ একদিকে কেবল তাঁবু আর তাঁবু, অস্ত্র-শস্ত্র আর ঘোড়া৷ অপরদিকে ছোটো ছোটো কয়েকটি তাঁবু৷ যেগুলোর মাঝে সবুজ রঙের বড়ো চাদর দেখতে পাওয়া যায়৷ একদিকে দুনিয়াপুজারী বলদর্পী সেনাদের আনন্দ-উল্লাস, অপরদিকে নবীজীর সন্তানের প্রতিরক্ষায় সত্যপূজারী একদল খোদাপ্রেমিক মানুষের দোয়া-দরুদের গুঞ্জরণ৷

সেনাপতিরা একের পর এক কুফার গভর্নরের কাছ থেকে চিঠি পাচ্ছে৷ চিঠির ভাষ্য হলো-'হোসাইন ইবনে আলীকে বলো,তাকে এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে অবশ্যই ইয়াযিদের বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে,অন্যথায় তার গর্দান নেবে৷' আরেকটি পত্রে বলা হয়েছে, ‘হোসাইনের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবে৷ এমনকি তার সাথীদেরকে এক ফোঁটা জলও নিতে দেবে না৷' ইমাম হোসাইন (আ) এর নূরানী চেহারায় সত্যের প্রতি ভালোবাসার ছাপ সুস্পষ্ট৷ কিন্তু কুফাবাসীর গোমরাহী তাঁর অন্তরমনকে আহত করেছে৷ তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের সেনাদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ 'দুনিয়াপূজারী মানুষ যখন আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকে, ধর্ম তখন তাদের কাছে খেলনা বস্তু বলে মনে হয়, অর্থাত্‍ তখন তারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে৷ তবে যখন তারা কোনো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তখন খুব কম লোককেই সত্য ও দ্বীনের ওপর অটল থাকতে দেখা যায়৷' রাতের বেলা মরুভূমিতে নেমে এলো রহস্যময় নীরবতা৷ হঠাত্‍ শত্রুসেনাদের মাঝ থেকে একটা আনন্দধ্বনি ভেসে উঠলো৷ ইমামের সঙ্গীরা তাঁদের তাঁবুগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে এলো এবং পরিখা খনন করে শত্রুদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো৷

নামায শেষে ইমাম তাঁর সাথীদের মাঝে গেলেন৷ গভীর দৃষ্টি দিয়ে তাদের দিকে তাকালেন৷ তারপর তাঁর কণ্ঠধ্বনি রাতের নিরবতা ভেদ করলো৷ 'আমি তোমাদের মতো বন্ধু এবং নিজের পরিবারের মতো পরিবার আর দেখি নি৷ আমার সাথে তোমরা যে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছো, আমি সেই বন্ধন তুলে নিলাম এবং তোমরা যে আমার হাতে বাইয়াত হয়েছো তার দায় থেকেও আমি তোমাদের মুক্ত করে দিলাম৷ এখন তোমাদের সবাইকে আমি অনুমতি দিচ্ছি তোমরা যে পথ দিয়ে এসেছো, সেপথে পুনরায় চলে যেতে পারো৷ রাতের আঁধারে তোমরা চলে যাও৷ যেসব সৈন্য এখানে এসেছে, তারা কেবল আমাকেই চায় তোমাদরকে নয়৷' বীরত্ব ও সাহসিকতার অনন্য পরাকাষ্ঠা ইমাম হোসাইন (আ) এর ভাই আব্বাস সবার আগে এগিয়ে এসে বললেন, 'আমরা তোমাকে একা রেখে নিজ নিজ শহরে ফিরে যাবো-এরকম কোনো দিন যেন না আসে৷' এরপর মুসলিম ইবনে আওসাজা উঠে বললেন, ' হে নবীর সন্তান! চারদিক দিক থেকে যখন শত্রুরা তোমাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, তখন আমরা তোমাকে ছেড়ে চলে যাবো ? আল্লাহর দরবারে আমরা এর কি জবাব দেবো ? আমরা শহীদ না হওয়া পর্যন্ত তোমার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করে যাবো এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবো৷' সাআদ ইবনে আব্দুল্লাহ হানাফি বললেন, হে নবীর সন্তান! আমরা তোমাকে একা ছেড়ে যাবো না৷ আমরা আল্লাহর দরবারে এ বার্তা পৌঁছাতে চাই যে,প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর পর তোমার সহযোগিতায় থেকে প্রকারান্তরে তাঁকেই আমরা সাহায্য করেছি৷'

যাহির ইবনে কায়েন বললেন, 'খোদার শপথ, ইচ্ছে করে একবার মরে আবার জীবিত হই, আবার মরে আবার জীবিত হই-এভাবে হাজারবার মরে বেঁচেও চাই নবীজীর খান্দান এবং এই যুবকদের জীবন সকল প্রকার বালা-মুসিবত্‍ থেকে রক্ষা পাক৷' কাসেম নামের তেরো বছরের একটি শিশু ইমামের পাশে চীত্কা র করে বললো,চাচাজান! আমিও কি এই যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যাবো ? ইমাম তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মৃত্যুকে তুমি কীভাবে চিন্তা করো ? কাসেম বললো, 'চাচাজান! আল্লাহর দ্বীনের সহযোগিতা করতে গিয়ে এবং জুলুম-অত্যাচার দূর করতে গিয়ে যেই মৃত্যু তাকে আমি মধুর চেয়ে মিষ্টি বলে মনে করি৷' ইমাম এবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,হ্যাঁ, ভাতিজা আমার,তুমিও শহীদ হবে৷ একথা শুনে এই কিশোর অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হবার জন্যে গেল৷ আর ইমাম হোসাইন (আ) চাঁদের রূপালি জ্যোত্স্নাুয় তাঁর সঙ্গী-সাথীদের জন্যে দোয়া করলেন৷ অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে তিনি শত্রুদের শিবিরগুলোর দিকে তাকিয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৭৮ এবং ১৭৯ নম্বর আয়াতদুটি তিলাওয়াত করলেনঃ ‘কাফেররা যেন এই চিন্তা না করে যে,তাদের আমরা যে অবকাশ দিয়েছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে৷ আমরা তাদেরকে অবকাশ দেই এইজন্যে যে,যাতে তারা তাদের গুনাহের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তোলে,তাদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি৷ এটা সম্ভব নয় যে, আল্লাহ মুমিনদেরকে তাদের অবস্থার মধ্যে ফেলে রাখবেন, তবে যে পর্যন্ত না ভালো থেকে মন্দ আলাদা হয়৷

আশুরা বিপ্লব-৪: কারবালায় গড়ে ওঠা পৃথক দুটি শিবিরের কথা আমরা বলেছি৷ একটিতে আনন্দ-উল্লাস আর অপরটিতে ইবাদাত-বন্দেগিপূর্ণ এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ৷ এভাবে দিন যাচ্ছে আর ইমামের শত্রু শিবিরে বিভিন্নরকম ঘটনা ঘটছে৷ ইবনে সাআদের দল যেন অপেক্ষা করতে পারছে না৷ তারা যতো দ্রুত সম্ভব ঘটনা ঘটিয়ে পুরস্কার গ্রহণের চিন্তায় ব্যস্ত৷ কিন্তু শত্রুপক্ষীয় মহাবীর হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহি হঠাত্‍ অদ্ভুত এক আচরণ শুরু করে দেয়৷ সে অবিশ্বাস্যরকমভাবে একবার এদিকে আবার ওদিকে তাকাতে থাকে৷ ভীষণ এক অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসেছে৷ যেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ভাবছে সে কিংবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে৷ হ্যাঁ, একধরনের সন্দেহের দোলাচলে দুলছে সে৷ একদিকে ইমাম হোসাইন (আ) জনগণকে মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় সত্য-ন্যায়ের পতাকাতলে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, অপরদিকে তাঁকে হত্যা করার মধ্যে রয়েছে পার্থিব স্বার্থ সিদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ৷ কি করবে না করবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে হঠাত্‍ সে চলে যায় কুফার সেনাপতি ওমর ইবনে সাআদের কাছে৷ হুর তাকে জিজ্ঞেস করে-হে ওমর! তুমি কি সত্যিই হোসাইনের সাথে যুদ্ধ করবে ? ওমর জবাব দেয়-হ্যাঁ,খোদার কসম নৃশংসতম যুদ্ধ করবো৷

হুর শিহরিত হলো৷ তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল৷ তার পাশের একজন বলে উঠলো-এই হুর!তোর কী হয়েছে? তোকে কখনো এমন পেরেশান হতে দেখি নি! তোকে তো আমি সবসময় বীর-মহাবীর হিসেবেই দেখেছি৷ হুর বললো-দোযখ এবং বেহেশতের মধ্য থেকে কোনো একটিকে নির্বাচন করা উচিত৷ সেই নির্বাচনের মোক্ষম সময় এখন৷ এই বলেই চিত্কাের করে উঠলো সে-খোদার শপথ! আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেললেও বেহেশত ছাড়া অন্য কিছুই আমি বেছে নেবো না৷ কিছুক্ষণ পর কুফার এই মহাবীর কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে ইমাম হোসাইন (আ) এর শিবিরের দিকে যায়৷

অশ্রুসজল চোখে নম্রকণ্ঠে বলে-হে খোদা! তোমার পথে ফিরে এসেছি৷ আশা করি তুমি আমার তওবা কবুল করবে৷ হে খোদা! তোমার বন্ধু এবং রাসূলের সন্তানের অন্তরকে আমি সন্ত্রস্ত করেছি, আমার এই মহাপাপ তুমি ক্ষমা করে দিও৷ এরপর ইমামের সামনে গিয়ে বললো-'হে রাসূলে খোদার সন্তান! তোমার জন্যে আমার জীবন উত্সার্গ হোক৷ আমি হুর, আমি সেই হুর যে তোমার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল৷ খোদার কসম, বিশ্বাস করতে পারি নি তোমার সাথে এরকম আচরণ করা হবে৷ আমি এখন আমার কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত৷ সেইসাথে আমি এখন তোমার পথে আমার জীবন উত্সির্গ করার জন্যে প্রস্তুত৷ আল্লাহ কি আমার তওবা কবুল করবেন ? ইমাম অত্যন্ত দয়ার্দ্র কণ্ঠে বললেন,'হ্যাঁ, আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী৷ আল্লাহর রহমত তোমার ওপর বর্ষিত হোক৷ হুর বললো, যুদ্ধের ময়দানে সর্বপ্রথম আমাকে যাবার অনুমতি দিন৷ ইমাম তাকে তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলেন৷ ওমর ইবনে সাআদ ইমামের শিবির লক্ষ্য করে প্রথম তীর নিক্ষেপ করে৷

তার একাজের সাক্ষীও সে রেখে দেয়৷ হুর বীরবিক্রমে ইয়াযিদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে থাকেন৷ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে অবশেষে হুর শাহাদাত লাভ করেন৷ কারবালায় এরকম আরো কটি চিত্র আমরা লক্ষ্য করবো৷ যেমন আবেস ইবনে শাবিব শাকেরী৷ তিনি ইমামের কাছে এসে বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে তুমিই আমার কাছে সবচে প্রিয়তম ব্যক্তি৷ হে পুন্যকারীদের সন্তান! তুমি স্বাক্ষী থাকো, আমি তোমার এবং তোমার নানা মহানবী (সা) এর পথে আন্তরিকতার সাথে আপন প্রাণ উত্স র্গ করলাম৷ এই বলে অনুমতি নিয়ে তিনি যুদ্ধে যান৷ আবেসকে চিনতে পেরে ওমর ইবনে সাআদের পক্ষের একজন বলে উঠলো-আমি যুদ্ধের ময়দানে আবেসের যুদ্ধ কৌশল দেখেছি৷ সে অত্যন্ত সাহসী এক বীরযোদ্ধা৷

একথা শুনে ওমর ইবনে সাদ অসংখ্য সেনাকে তার সাথে লড়বার আদেশ দেয়৷ অবশেষে একাকী সবার সাথে লড়ে শেষ পর্যন্ত তিনিও শাহাদাতবরণ করেন৷ ওমর ইবনে সাআদের চাচাতো ভাই হাশেম ইবনে উতবা ইমামের খেদমতে এসে বললেন, আমি আপনার সহযোগিতায় আমার প্রাণ বাজি রেখে এসেছি৷ ইমাম তাঁর জন্যে দোয়া করলেন৷ হাশেম যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে হাঁক ছাড়লো-আমি আমার চাচাতো ভাই ওমর ইবনে সাআদ ছাড়া অন্য কারো সাথে লড়তে আসি নি৷ হে ওমর! তুই কীভাবে দ্বীনের ইমামকে হত্যা করার জন্যে কোমর বেঁধে লেগেছিস ? ইমাম নবীজীর সন্তান৷ কী অদ্ভুত কথা,ফোরাতের পানি রাসূলে খোদার খান্দান ব্যতীত সবার জন্যে উন্মুক্ত করেছিস! ওমর ইবনে সাআদ চাচাতো ভাই হাশেমের সাথে লড়তে পারবে না জেনে কৌশলে তার মুখোমুখি হওয়া থেকে নিজে বিরত থেকে তার সেনাদেরকে সামনে ঠেলে দেয়৷ সেনারা চারদিক থেকে হাশেমকে ঘিরে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করে৷ ওহাব ইবনে আব্দুল্লাহ তাঁর মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে কারবালায় আসে৷ তার মা তাকে যুদ্ধে যাবার জন্যে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে বল্লেন-বাবা! কিসের অপেক্ষায় আছো৷ ওঠো, রাসূলে খোদার পরিবারের সমর্থনে এগিয়ে যাও৷ ওহাব যুদ্ধ করতে করতে দু'হাত হারায়৷

মা তা দেখে বলে উঠে দাঁড়াও! রাসূলে খোদার হেরেম রক্ষা করো৷ ইমাম হোসাইন (আ) কাছে এসে বললেন-হে মা! তোমার তাঁবুতে ফিরে যাও৷ আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করবেন৷ এভাবে ইসলাম রক্ষার্থে, নবীজীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে, সত্‍ কাজের আদেশ এবং অসত্‍ কাজের নিষেধের দায়িত্ব পালনে নির্মমভাবে শাহাদাত্ব রণ করেন ইমাম হোসাইন (আ) সহ তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ৷ তাঁদের এই ঐতিহাসিক আত্মদানের মধ্য দিয়ে রচিত হয় ইতিহাসের সবচে নির্মমতম ও বেদনাঘন মহান আদর্শ৷ যে মহা আদর্শের নায়ক হলেন নবীজীর প্রিয় সন্তান ইমাম হোসাইন (আ)৷ আর প্রতিপক্ষে ছিল ইসলামের ইতিহাসের সর্বনিকৃষ্ট চরিত্র ও কাপুরুষ ইয়াযিদ৷ এটি এমন একটি অভিশপ্ত নাম যে নামটির উচ্চারণে মুসলমানমাত্রই দ্বিধাগ্রস্ত৷ পক্ষান্তরে ইমাম হোসাইনের নামের সাথে মিল রেখে মুসলমানরা তাদের সন্তানদের নাম রাখছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে৷ এখানেই সুস্পষ্ট হয়ে যায় সত্য-মিথ্যা৷ এখানেই সূচিত হয় মুহররম বিপ্লবের বিজয়৷

আশুরা বিপ্লব-৫: পবিত্র তাসূয়া বা নয়ই মহররম হচ্ছে শহীদগণের নেতা হযরত ইমাম হোসাঈন (আঃ)'র শাহাদাত লাভের আগের দিবসের বার্ষিকী৷ ইসলাম ধর্মকে ভেতর থেকে নিষ্প্রাণ ও বিকৃত করার যে প্রক্রিয়া উমাইয়া শাসকরা শুরু করেছিল ইসলামী খেলাফতের আসনে ইয়াজিদের আরোহন ছিল এই বিকৃতিকে পাকাপোক্ত করার চূড়ান্ত ব্যবস্থা৷ আর এ সময়ই ইসলামকে চিরতরে বিকৃত করার প্রচেষ্টা নস্যাতের জন্যে এগিয়ে আসেন বিশ্বনবী (সাঃ)'র সুযোগ্য দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)৷

একদিকে এজিদের নেতৃত্ব মেনে নেবার জন্যে প্রবল চাপ ও অন্যদিকে মুসলমানদের ইমাম হিসেবে তাঁর প্রতি কুফা নগরীর জনগণের ব্যাপক সমর্থন ঘোষণার প্রেক্ষাপটে তিনি জনগণকে ‍এজিদের তাগুতি শাসনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করার প্রয়াস পান এবং কুফার দিকে অগ্রসর হন৷ কিন্তু ইমাম হোসাইন (আঃ) পথিমধ্যে এজিদের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বার বার বাধাপ্রাপ্ত হন৷ অবশেষে কারবালার প্রান্তরে উমর বিন সাদের নেতৃত্বে ইয়াজিদের চার হাজার সেনা ৭২ জন সঙ্গীসহ ইমাম হোসাইন (আঃ) ও তাঁর পরিবার পরিজনকে হয় ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার নতুবা যুদ্ধ এ দুইয়ের যে কোনো একটি পথ বেছে নেয়ার আহ্বান জানায়৷ ইমাম হোসাইন (আঃ) চূড়ান্ত যুদ্ধের আগে মহান আল্লাহর দরবারে নিবিষ্টচিত্তে শেষবারের মতো নৈশ এবাদতে মশগুল হবার জন্যে একটি দিন সময় চেয়ে নেন৷ এরপরের ঘটনা সবারই কম-বেশী জানা আছে৷

দশই মহররম তারিখে ইমাম হোসাঈন (আঃ) ও তাঁর ৭২ জন সঙ্গী-সাথী শাহাদত লাভের কথা নিশ্চিত জেনেও বীর বিক্রমে ইয়াজিদের তাগুতী সেনাদের সাথে লড়াই করে শহীদ হন৷ তাঁদের আত্মত্যাগ ইসলাম ও মানবতার মর্যাদা রক্ষা করতে সমর্থ হয় এবং তাঁরা ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগরণের চিরন্তন প্রতীক ও ইসলাম ধর্মের প্রকৃত চেতনার রক্ষক হিসেবে অমরত্ব লাভ করেন৷ ইমাম হোসাঈন (আঃ)ও তাঁর সঙ্গীদের বীরত্ব ও পবিত্র খুন ইসলামের চিরসবুজ বৃক্ষে পুণরায় প্রাণের সঞ্চার করে৷ তাইতো আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন, আঁজলা ভরে আনলো কি প্রাণ কারবালাতে বীর শহীদান? হ্যাঁ, ইসলামকে ভেতর থেকে নিষপ্রাণ করার ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া ছাড়াও ইমাম হোসা‍ইন ও তাঁর সঙ্গীরা প্রাণের অফুরন্ত জোয়ার সৃষ্টি করে গেছেন মুক্তিকামী মানুষের প্রাণপ্রবাহে৷ ইমাম হোসা‍ইন (আঃ)'র এ বিপ্লব যুগে যুগে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনগুলোর জন্যে আধ্যাত্মিক দিশারী হিসেবে কাজ করছে৷

ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবসহ বর্তমান যুগের বিশ্ব-ইসলামী জাগরণও এর ব্যতিক্রম নয়৷ একইসাথে কারবালার শহীদানদের আত্মত্যাগ শাহাদতের সংস্কৃতিকে দিয়েছে সর্বোচ্চ মহিমা ও সাফল্যের প্রাণস্পর্শ৷ এছাড়াও কারবালার বীরত্ব গাঁথার প্রতিটি পরতে খুঁজে পাওয়া যায় পবিত্র কোরআনের আলোকোজ্জ্বল শিক্ষার প্রাণবন্ত ছোঁয়া৷ আলোকঔজ্জ্বল্যে চিরভাস্বর সেইসব কিছু দিক আমরা এখন তুলে ধরার চেষ্টা করবো৷ পবিত্র কোরআন মানুষকে সৌভাগ্য ও মর্যাদা ও পবিত্রতার দিকে আহ্বান করে৷ আর এজন্যেই কোরআন মানুষকে আহ্বান জানায় অন্যায় ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে৷ ইমাম হোসাঈন (আঃ)ও পবিত্র কোরআনের এ শিক্ষার আলোকেই এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে মানুষ যেন কোনো অবস্থাতেই জালেম ও দূর্নীতিবাজ শাসকদেরকে মানুষের স্বাধীনতা, সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করার অনুমতি না দেয়৷ ইমাম হোসাঈন (আঃ) কারবালার বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের হারিয়ে যাওয়া সম্মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন এবং তাতে সফল হয়েছিলেন বলেই তাঁর বিপ্লব যুগ ও স্থানের গন্ডী পেরিয়ে কালোত্তীর্ণ ও চিরন্তন মর্যাদা লাভ করেছে৷

ঠিক এ কারণেই পবিত্র মদীনা শহরে ইয়াজিদের প্রতিনিধি যখন ইমাম হোসাঈন (আঃ)কে ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকারের আহ্বান জানায় তখন তিনি পবিত্র কোরআনের সুরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করে শুনিয়ে দেন যাতে খেলাফতের ওপর নবী বংশের অধিকার এবং বনি উমাইয়াদের শাসনের আইনগত ভিত্তিহীনতা ফুটে উঠে৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, হে নবী পরিবার বা রাসূলের আহলে বাইত, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তো চাচ্ছেন তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখতে৷ সত্যের পথে নির্ভিক থাকা ও একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা পবিত্র কোরআনের আরেকটি শিক্ষা৷ ইমাম হোসাঈন (আঃ) এমন সময় ইয়াজিদের তাগুতি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়য়েছিলেন যখন তত্কা লীন সমাজের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইয়াজিদের ভয়ে সন্ত্রস্ত ছিলেন৷

এমনকি তারা ইয়াজিদের মোকাবেলা না করতে ও এ সংগ্রামে নেমে বেঘোরে প্রাণ না দিতে ইমাম হোসাঈন (আঃ)কে পরামর্শও দিয়েছিলেন৷ কিন্তু ইমাম তাঁর লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল ও পুরোপুরি আস্থাশীল৷ তিনি তথাকথিত শান্তিকামীদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কোরআনের সুরা হুদের এ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, আমি আমার সাধ্যমত সংস্কার করতে চাই, আমার কার্যসাধন আল্লাহরই সাহায্যে, আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং আমি তাঁরই অভিমুখী৷ ইমাম হোসা‍ইন ইয়াজিদের স্বৈর ও তাগুতি শাসন মেনে নিতে অস্বীকার করে যখন বিপ্লবী উদ্দেশ্য নিয়ে মদীনা ত্যাগ করেন তখন তাঁর অবস্থা ছিল অনেকটা সূরা কাসাসে বর্ণিত ২১ নম্বর আয়াতের মতো৷ এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘মূসা বললো, হে আমার প্রতিপালক তুমি জালেম সমপ্রদায়ের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করো৷ ' পবিত্র কোরানের দৃষ্টিতে সম্মান ও মর্যাদা শুধু ঈমানদারদেরই প্রাপ্য এবং সসম্মানে মৃত্যুবরণ করা অমরত্বেরই নামান্তর৷ অন্যদিকে কোরআন অবমাননা ও লাঞ্ছনার কাছে নতি স্বীকার করাকে পর্যায়ক্রমিক মৃত্যু বলে মনে করে৷

আর এজন্যেই পবিত্র কোরআনের এ নীতির ভিত্তিতেই ইমাম হোসা‍ইন (আঃ) বলেছিলেন, অপমান আমাদের স্পর্শ করতে পারে না৷ সূরা মুনাফিকুনের অষ্টম আয়াতেও বলা হয়েছে, সম্মান একমাত্র আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সাঃ) ও বিশ্বাসী বা মুমিনদের জন্যে নির্ধারিত৷ যে কোনো সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রধান শর্ত হলো দূর্নীতি ও অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং সত্‍ কাজের বিস্তার৷ পবিত্র কোরআনের সমাজে দৃষ্টিতে সত্‍ কাজের উত্সা হ ও অসত্‍ কাজের নির্দেশ না থাকলে তা দূর্নীতি এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়৷ ইমাম হোসাইন (আঃ) এ কারণেই কারবালার মহাজাগরণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন৷

তিনি ইয়াজিদের বাহিনীকে অপবিত্রতার দৃষ্টান্ত বলে মনে করতেন এবং নিজ কন্যার কাছে ইয়াজিদী শক্তির পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে সুরা মুজাদিলার ১৯ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেছেন৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে, শয়তান তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং শয়তান তাদের মন থেকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে৷ ইমাম হোসাইন (আঃ)'র বিপ্লবের আরো একটি বড় দিক হলো ধর্মের পুণরুজ্জীবন, নামাজ ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধগুলোর বিকাশ বা বিস্তৃতি৷ ইমাম হোসাইন (আঃ)'র অনুসারীরা জিহাদের পাশাপাশি প্রার্থনা, নামাজ ও মহান আল্লাহর ওপর ভরসার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখিয়েছেন৷ ইমাম হোসাঈন (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীরা সব সময়ই, এমনকি আশুরার দিনে তুমুল সংঘাতের সময়ও জামাতে নামাজ আদায় করেছেন৷ আশুরার রাত থেকে সূর্য্য উদয় পর্যন্ত তাঁরা নামাজ, দোয়া, তওবা ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল ছিলেন৷ যারা আল্লাহর পথে নির্ভিক ও হাসিমুখে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে জীবন বিলিয়ে দেয়, পবিত্র কোরান তাঁদেরকে বেহেশতে সুসংবাদ দেয় এবং তাঁদেরকে আল্লাহর মনোনীত বিশেষ বান্দা বলে ঘোষণা করেছে৷ ইমাম হোসা‍ইন (আঃ)ও তাঁর সঙ্গীদরকে বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন এবং তাঁদেরকে শ্রেষ্ঠ সঙ্গী বলে অভিহিত করেছিলেন৷ 

শাহাদতের অমিয় সুধা পানের জন্যে ব্যাকুল ইমাম ও তাঁর সঙ্গী ও এমনকি তাঁর কিশোর পুত্র এবং ভাতিজার কাছেও আল্লাহর পথে শাহাদত ছিল মধুর চেয়েও মিষ্টি৷ আর এ কারণেই বলা যায়, কারবালার বিপ্লব মুসলিম সমাজের শিরায় শিরায় যুগে যুগে সঞ্চারিত করেছে হাজারো শক্তির প্রাণময় প্রবাহ যা অফুরন্ত ও চিরপ্রবর্ধমান৷

আশুরা বিপ্লব-৬: মহররমের ১০ তারিখে অর্থাত্‍ পবিত্র আশুরার দিন রাসূল (সাঃ)এর দৌহিত্র এবং আমিরুল মোমেনীন ও হযরত ফাতেমা (সাঃ)এর প্রানাধিক প্রিয় পুত্র ইমাম হুসাইন (আঃ) কারবালার ময়দানে ‍এজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে শাহাদাতবরণ করেন৷ ইমাম হুসাইন (আঃ) ইয়াজিদের অন্যায় দাবীর প্রতিবাদে সেদিন যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তা বিশ্ববাসীর জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে৷ ইমাম হুসাইনের ত্যাগ ও কুরবানীকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানরা আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে যাচ্ছে৷ আর ইমাম হুসাইনের আদর্শকে ধারণ করেই ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে৷ এ প্রসঙ্গে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী (রহঃ) বলেছেন, 'আমাদের যা কিছু অর্জন করেছি, তার সবই পবিত্র আশুরা ও শাহাদাতে কারবালা থেকে'-অর্থাত্‍ আমরা যা যা ভাল জিনিস পেয়েছি, নতুন সমাজ গড়েছি, বিশ্বের বুকে নতুন করে মহানবী (সাঃ) আনীত প্রকৃত ইসলামকে পেয়েছি-তার সবই শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর শাহাদাত থেকেই পেয়েছি৷ একথা সবাই জানে যে, ঐতিহাসিক কারবালা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইমাম হুসাইন ও ইয়াজিদের মধ্যে৷ যুদ্ধের মূল ঘটনা বর্ণনার আগে আমরা এই দুই ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছি৷ ইমাম হুসাইন ছিলেন রাসুলের নাতি এবং আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী ও হযরত ফাতিমা (সাঃ আঃ)'র পুত্র৷ রাসূল (সাঃ) ইমাম হুসাইনকে অত্যন্ত ভালবাসতেন৷ তিনি বলতেন, 'হুসাইন আমা হতে আর আমি আমি হুসাইন হতে৷' আবু হুরাইরা বলেছেন, একদিন রাসুল (সাঃ) ইমাম হাসান ও হুসাইনকে কাঁধে বসিয়ে আমাদের দিকে এলেন৷

এ সময় তিনি সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, যে আমার এই দুই সন্তানকে ভালবাসবে সে আমাকে ভালবাসলো আর যে তাদের সাথে শত্রুতা করবে সে আমার সাথে শত্রুতা করলো৷ ' নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন যে, 'যখন আবু সুফিয়ানের পুত্র মুয়াবিয়া এবং মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদ ইসলামকে ধ্বংস এবং এর নাম নিশানা মুছে দিতে চাইবে তখন ইমাম হুসাইনের মাধ্যমে ইসলাম পুনরুজ্জীবিত হবে৷' ইমাম হুসাইনের পর এবার আমরা কারবালা যুদ্ধের খলনায়ক- পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছি৷ ইয়াজিদ ছিল আমীর মুয়াবিয়ার পুত্র৷ সে ছিল মদ পানকারী, অত্যাচারী, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও ভোগবিলাসী একজন যুবক৷ মানব চরিত্রের এমন কোন বদগুণ নেই যা ইয়াজিদের মধ্যে ছিল না৷ মুয়াবিয়া তার অযোগ্য পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী শাসক হিসেবে নিযুক্ত করলেও জনগন তা মেনে নেয় নি৷

কারণ শয়তানি ও লম্পট আচরণের জন্য জনগন তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল৷ যা হোক, জনগণের মতামতকে না মেনে পিতার মৃতু্যর পর ইয়াজিদ মুসলিম জাহানের শাসক হিসেবে নিজেকে ঘোষনা করে৷ কিন্তু সে জানতো যে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে ইমাম হুসাইনের বায়াত বা আনুগত্য জরুরী৷ তাই সে ক্ষমতায় বসেই মদীনার গভর্ণর অলিদ ইবনে ওতবাকে হুকুম দেয় যে, ইমাম হুসাইন যেন ইয়াজিদের শাসন মেনে নেয়৷ আর অস্বীকার করলে যেন তাঁকে হত্যা করা হয়৷ মদীনার গভর্ণর যখন ইমামকে একথা জানালেন তখন ইমাম বললেন',নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবো৷ তিনি গভর্ণরকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি আল্লাহর পরিবর্তে কখনো শয়তানের কাছে আত্মসমর্পন করবেন না৷

ইমামের বলিষ্ঠ বক্তব্য শুনে ইয়াজিদ শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করলো৷ এ অবস্থায় তিনি বাধ্য হয়ে মক্কায় চলে যান৷ কিন্তু মক্কাতেও উয়াজিদের সড়যন্ত্র থেমে থাকলো না৷ ইয়াজিদ কাবার পবিত্র প্রাচীরের মধ্যে গোপনে ইমামকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলো৷ এ সময় কুফা থেকে হাজার হাজার চিঠি আসে ইমামের কাছে৷ তারা ইমামকে কুফা যেতে আবেদন জানায় যেন তারা জালেম ইয়াজিদি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারে৷ অবস্থায় কাবার পবিত্রতা রক্ষা এবং নিরাপত্তার খাতিরে ইমাম তাঁর সঙ্গী সাথীদের নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন৷ যাত্রা পথে তিনি কখনো ইঙ্গিতে আবার কখনো সরাসরি ঘোষণা দেন,' আমার যাত্রার উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াজিদের অনৈসলামী শাসনের প্রতিবাদ করা; অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং মুহাম্মদী ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটানো৷ সঙ্গী সাথীদের নিয়ে যখন তিনি কারবালায় পৌঁছলেন তখন তার ঘোড়াটি রহস্যজনকভাবে থেমে গেল এবং তা কোনমতেই আর নড়ল না৷ এ সময় ইমাম বললেন,'এই সেই ভূমি, যা আমাদের জন্য কষ্টের ও নির্যাতনের৷' এরপর ইমাম ঘোড়া থেকে নেমে সেখানে তাঁবু তৈরী করার জন্য তার অনুসারীদের নির্দেশ দিলেন৷

এদিকে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনী কারবালার মরুভূমিতে ইমামের সঙ্গী সাথীদেরকে ঘেরাও করে রাখলো৷ তারা অত্যনত্ম অমানবিকভাবে ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দিল৷ ইমামের তাঁবুতে পানির অভাবে হাহাকার পড়ে গেল৷ ইয়াজিদ ফরমান জারি করলো 'হয় তাকে শাসক হিসেবে নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে অথবা ইমাম হুসাইনকে মৃত্যুবরন করতে হবে৷' কিন্তু ইমাম হুসাইন ইয়াজিদের এই অন্যায় হুমকির তোয়াক্কা না করে হাতে যা ছিল তা-ই নিয়ে ইয়াজিদ বাহিনীকে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিলেন৷ ১০ই মহররম ভোর বেলায় ইয়াজিদের হাজার হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন ঈমানের বলে বলিয়ান এক ক্ষুদ্রবাহিনী৷ এ দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশের কবি আসাদ বিন হাফিজ তাঁর কারবালা কাহিনী কবিতায়৷ কবি লিখেছেন-  কম বেশী সকলের জানা কাহিনী মুখোমুখি দুই দল সেনাবাহিনী৷

একদল সত্যের পতাকাবাহী আরেক দল দুনিয়ায় চায় বাদশাহী৷ সত্যের দলনেতা ইমাম হোসেন বাদশাহী আশা বুকে এজিদ পোষেণ৷ নবীজির নাতি তিনি, পুত্র আলীর ফাতেমার নয়নের মনি মহাবীর৷ ইমাম হোসেন নাম, হাসানের ভাই তাঁর সাথে এজিদের বাঁধলো লড়াই৷ মুক্ত কৃপাণ হাতে দুই দল খাড়া চারদিকে বেজে উঠে কাড়া নাকাড়া৷ শন শন তীর ছোটে এদিক-ওদিক ঘোড়ার খুরের আওয়াজ বাজে চারদিক৷ ফোরাত নদীর কুল কারবালা মাঠ মানুষের লাশ দিয়ে হ'ল তা ভরাট৷ এজিদের তাঁবু জুড়ে বাসা বাঁধে ভয় অবশেষে থামে এই যুদ্ধ প্রলয়৷ লড়াই থামলে ইমাম তাকিয়ে দেখেন সাথী হারা তিনি যেন একাকী আছেন৷ মনের দুঃখে ইমাম হয়ে অসহায় নিজেকে লুটিয়ে দেন মরু বালুকায়৷ তখন সেখানে এক পাষন্ড সীমার এসে নিজ হাতে কাটে ইমামের ঘাড়৷ ছিন্ন মসত্মক গেঁথে বর্শার আগায় নরপশু ছুটে চলে এজিদ সভায়৷

কম বেশী সকলের এই জানা কাহিনী স্মরণে আস্লে ফেলে দু'চোখের পানি৷ হাজার বছর আগে মহররম মাসে ঘটেছিল আজও তবু হৃদয়ে তা ভাসে৷  পরিশেষে বলতে চাই, ইমাম হুসাইন (আঃ) জালিম ইয়াজিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন যে, কোন শাসক ইসলামের নীতিমালা থেকে দুরে সরে গেলে কিংবা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করলে তার বিরুদ্ধে নিজের সাধ্যনুযায়ী সংগ্রাম করতে হবে৷ ইমাম হুসাইন তাঁর নিজের, পরিবার পরিজনের এবং সঙ্গী সাথীদের জীবন উত্সয়র্গ করে ইসলামকে যেভাবে রক্ষা করে গেছেন, তেমনিভাবে বিশ্বের সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে সে দৃষ্টানত্ম অনুসরণ করতে হবে৷ তাহলে ইমাম হুসাইন ও তাঁর সঙ্গী সাথীদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে৷