সূরা বাকারাহ'র ২৬৪ ও ২৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ
 
وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ (264) وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاةِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآَتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِنْ لَمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلٌّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
"হে বিশ্বাসীগণ, দানের কথা প্রচার করে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির মত নিস্ফল কর না,যে নিজের সম্পদ থেকে লোক দেখানোর জন্য দান করে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন শক্ত পাথরের মত, যার ওপর কিছু মাটি থাকে, কিন্তু প্রবল বৃষ্টিপাত তা পরিস্কার করে দেয়, ফলে কোন বীজ থেকেই আর গাছ উদগত হয় না এবং যা তারা উপার্জন করেছে,তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (২:২৬৪)
"যারা আল্লাহর সন্তুটি লাভের জন্য ও নিজেদের আত্মার উন্নতির জন্য ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত উদ্যানের মত যাতে প্রবল বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফল মূল দ্বিগুণ জন্মে। যদি প্রবল বৃষ্টি না-ও হয়, তবে শিশিরই যথেষ্ট। তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন।" (২:২৬৫)
 
এর আগের কয়েকটি আয়াতে আল্লাহর পথে দান করার জন্য বিশ্বাসী বা মুমিনদেরকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আর এ দুই আয়াতে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দান ও অগ্রহণযোগ্য দানকে দু'টি উপমা দিয়ে বুঝানো হয়েছে। কপট দানশীল ব্যক্তির লোক দেখানো দানকে শক্ত পাথরের ওপর অল্প কিছু নরম মাটির সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর শক্ত পাথরে উদ্ভিদ জন্মে না। তাই তার দানে অন্য মানুষের উপকার হলেও তার নিজের মধ্যে কোন প্রভাব পড়ে না এবং নিজে ঐ দানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। আর যে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুটির উদ্দেশ্যে তথা মানুষের বাহবা পাবার আশা না করেই পবিত্র উদ্দেশ্যে দান করে তাঁর দান উচুঁ ভূমির উচ্চ ফলনশীল জমিতে বোনা বীজের মত। তাতে বৃষ্টি কম বা বেশী যা-ই হোক না কেন নীচু জমির চেয়ে অন্তত দুইগুণ বেশী ফলন হয়। কারণ, এই জমি বৃষ্টির পানিকে খুব ভালভাবে ধরে রাখতে পারে এবং গাছের মূলও এ জমিতে সুদৃঢ়ভাবে বিকাশের সুযোগ পায়।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-

প্রথমত : সৎ উদ্দেশ্যে বা পবিত্র নিয়তে সমাজের জন্য কিছু করা হলে তার মূল্য পাওয়া যাবে। অসৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বা লোক দেখানোর জন্য করা ভালো কাজের কোন মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।
দ্বিতীয়ত : লোক দেখানো ভাল কাজ কেয়ামত ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস না থাকারই প্রমাণ।
 
এরপর ২৬৬তম আয়াতে বলা হয়েছে-
 
أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَنْ تَكُونَ لَهُ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَأَعْنَابٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ لَهُ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَأَصَابَهُ الْكِبَرُ وَلَهُ ذُرِّيَّةٌ ضُعَفَاءُ فَأَصَابَهَا إِعْصَارٌ فِيهِ نَارٌ فَاحْتَرَقَتْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآَيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ
 
"তোমাদের কেউ পছন্দ করে যে, তার একটি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান হবে, এর তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে,আর এতে সর্বপ্রকার ফল-মূল থাকবে এবং সে বার্ধক্যে পৌছবে, তার দুর্বল সন্তান সন্ততিও থাকবে, এমতাবস্থায় এ বাগানের একটি অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিবায়ু আসবে,অনন্তর বাগানটি ভষ্মীভূত হয়ে যাবে। এমনিভাবে আল্লাহ তা'লা তোমাদের জন্যে নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেন-যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।" (২:২৬৬)
 
এই আয়াতেও একটি উপমা তুলে ধরা হয়েছে। কোন ব্যক্তি যখন লোক দেখানোর জন্য ভালো কাজ করে, কিন্তু এরপর অন্যকে কথা ও কাজে কষ্ট দেয়, এ ধরনের লোক যেন নিজেই নিজের কাজের ফল নষ্ট করে। দরিদ্র ও বঞ্চিতদেরকে দান করা হলো মানব-সমাজের বাগানে গাছ লাগানোর মত। খুব কষ্টকর এই কাজের প্রতিদান ও ফল রয়েছে। কিন্তু যদি এই কাজে সাবধানতা অবলম্বন করা না হয় এবং লোক দেখানোর মত সমস্যা এর সাথে যুক্ত হয় তাহলে এর কল্যাণ অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। পরিণামে দুর্ভোগ ও অনুতাপ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
 
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, একদিন মহানবী (সাঃ) মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বললেন,আল্লাহকে স্মরণ কর। প্রতিবার আল্লাহর জিকর বা আল্লাহর স্মরণের ফলে বেহেশতে তোমাদেরকে একটি গাছ দেয়া হবে। মুসলমানদের মধ্যে একজন বলল, তাহলে আমরা বেহেশতে অনেক বাগানের মালিক হয়ে যাব। নবী (সাঃ) বললেন, অবশ্য যে মুখ দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ কর, তা দিয়েই গীবত বা পরচর্চার কারণে সমস্ত গাছ পুড়ে যায়। বিচার দিবস বা কিয়ামতের দিন মানুষ সৎ কাজের মুখাপেক্ষী হবে। আর কিয়ামতের দিন যদি কেউ দেখতে পায় যে কপটতা এবং লোক দেখানো মানসিকতার কারণে তার কোন দান এমনকি কোন প্রার্থনা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি তাহলে তা কতই না বেদনাদায়ক হবে!
 
এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিক হলো, ভালো কাজ করে তা নিয়ে অহংকার করতে নেই। কারণ অন্য কোন খারাপ কাজ ভাল কাজের ফল ধ্বংস করে দেয়। অনেক কষ্ট করে গাছ লাগানোর পর বাগানের গাছ বড় হয় এবং ফলবান হয়। কিন্তু আগুনের কারণে এক মুহূর্তের মধ্যে বাগান পুড়ে যেতে পারে।

এরপরের আয়াত অর্থাৎ ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ وَلَسْتُمْ بِآَخِذِيهِ إِلَّا أَنْ تُغْمِضُوا فِيهِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ
 
"হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা যা উপার্জন কর ও যা আমি ভূমি থেকে উৎপাদন করি, তার মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর এবং তা থেকে এমন মন্দ বস্তু ব্যয়ের ইচ্ছা কর না, যা তোমরা চোখ বন্ধ করে বা একান্ত অনিচ্ছায় গ্রহণ কর। জেনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। তিনি মহাসম্পদশালী ও প্রশংসিত।" (২:২৬৭)
 

গরীব ও বঞ্চিতদেরকে কি দান করা উচিত এ নিয়ে মুসলমানরা রাসুল (সাঃ) কে প্রায়ই প্রশ্ন করতো। এই আয়াতে একটি সামগ্রীক নিয়ম উল্লেখ করে বলা হয়েছে,ভালো বা উৎকৃষ্ট সম্পদ থেকে দান করতে হবে। আয়-উপার্জন বা ব্যবসা থেকে যে টাকা বা সম্পদ অর্জিত হয় কিংবা ক্ষেত খামার থেকে যে ফসল উৎপাদিত হয়, তা থেকে দান করা উচিত। যেসব খাবার বা পোশাক পূরনো বা মূল্যহীন হয়ে গেছে, সে সব অন্যদের দান করা উচিত নয়। মদীনার কোন কোন মানুষ শুকনো ও অপেক্ষাকৃত নষ্ট খেজুর ফকিরদের দান করে ভালো খেজুর নিজেদের জন্য রেখে দিত। তাদেরকে তিরস্কার করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা যা ফকিরদেরকে দিলে তা যদি তোমাদেরকেই দেয়া হত, তাহলে কি তোমরা সে সব গ্রহণ করতে?

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো-
প্রথমত: দান খয়রাতের ক্ষেত্রেও গরীবদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। মূল্যহীন ও আজে বাজে জিনিষ দান করার অর্থ হলো অন্যদের অসম্মান করা।
দ্বিতীয়ত: দানের উদ্দেশ্য হলো কৃপনতা থেকে মুক্তি পাওয়া, অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ জিনিষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া নয়।
তৃতীয়ত: মানুষের বিবেক অন্যদের সাথে আচরণে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। যা আমরা পছন্দ করে না,তা যেন অন্যদের দান না করি।

সূরা বাকারাহ'র সূরার ২৬৮ ও ২৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেছেন

-الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَغْفِرَةً مِنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (268) يُؤْتِي
الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ (269
 
 
"দান খয়রাতের সময় শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং লোভ ও কৃপণতার মত বিভিন্ন জঘন্য কাজে উৎসাহ দেয়। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আল্লাহ প্রশস্ত মহাজ্ঞানী। (২:২৬৮)
"তিনি যাকে ইচ্ছা জ্ঞান বা প্রজ্ঞা দান করেন এবং যাকেই তিনি প্রজ্ঞা দেন, সে নিশ্চিতভাবে প্রচুর কল্যাণ লাভ করে। জ্ঞানীরা ছাড়া কেউই উপদেশ গ্রহণ করে না।" (২:২৬৯)
 
শয়তান ও শয়তানের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষেরা বিভিন্ন উপায়ে দান-খয়রাত ও অন্যকে সাহায্য করা থেকে মানুষকে বিরত রাখে। শয়তান এ কুমন্ত্রণা দেয় যে, তোমার নিজেরই তো অর্থ সম্পদের দরকার হবে। আবার কখনো এ কুমন্ত্রণা দেয় যে, কেন তুমি কষ্ট করছ বা কেন তাকে সাহায্য করছ ? যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে সে দরিদ্র ও অভাবী হত না। এ জাতীয় স্বভাবের লোকেরা অন্যদেরকে দান-খয়রাত করতে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করে এবং মানুষকে সম্পদ জমা করতে প্ররোচিত করে, একইসাথে তারা মানুষকে অভাব ও দারিদ্রের ভয় দেখায়। অথচ এ দুনিয়ায় আমাদের যতটুকু খোদার অনুগ্রহ দরকার, তার চেয়ে বেশী অনুগ্রহ দরকার হবে বিচার দিবসে। এছাড়াও যারা আল্লাহর রাস্তায় গরীবদের দান খয়রাত করে আল্লাহ তাদের ভবিষ্যত কল্যাণের নিশ্চয়তা দিয়েছেন অথাৎ তারা দারিদ্রের মোকাবেলায় বীমার সুবিধে পাবে। দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেকেই এই কৌশলপূর্ণ দিকের প্রতি গুরুত্ব দেন না এবং শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়। তারা শুধু অর্থ সম্পদকেই কল্যাণ বলে মনে করে। অথচ প্রকৃত কল্যাণ হলো, প্রজ্ঞা বা দূরদর্শীতার অধিকারী হওয়া এবং সঠিক পথ বাছাইয়ের ক্ষমতা লাভ করা। তাই প্রকৃত জ্ঞানীরা আল্লাহর ক্ষমার ওয়াদা সত্ত্বেও শয়তানের কুমন্ত্রণায় কান দেন না।
 
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হলো-
প্রথমত : দারিদ্রের ভয়ে কৃপনতা করা উচিত নয়। কারণ, শয়তানই দারিদ্রের ভয় দেখায় যাতে আমরা দান-খয়রাত না করি। তাই আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করার মাধ্যমে দারিদ্রের ভয় মন থেকে দূর করতে হবে।
দ্বিতীয়ত : সুস্থ বিবেকের অধিকারী ব্যক্তি শয়তানের প্রলোভন ও কুমন্ত্রণায় কান না দিয়ে আল্লাহর ওয়াদায় বিশ্বাস করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সেই জ্ঞানী যে আল্লাহর অনুগত। যে নিজের খেয়াল খুশী তথা প্রবৃত্তি, শয়তান ও খোদা বিরোধী লোকদের অনুসরন করে তাকে প্রকৃত জ্ঞানী বলা যায় না।
 
এরপর ২৭০ ও ২৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
 
 إِنْ تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِنْ تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَيُكَفِّرُ عَنْكُمْ مِنْ سَيِّئَاتِكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
 
"যা কিছু তোমরা দান কর বা মানত কর আল্লাহ তা জানেন। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।" (২:২৭০)
"তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর, তবে ভাল। আর যদি তা গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তকে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরো ভাল। এতে তোমাদের অনেক অকল্যাণ বা পাপ দূর হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন।" (২:২৭১)
 
দান-খয়রাতের পথে একটি বড় বাধা হলো, অধিকাংশ দাতা এটা চান যে, দানের জন্য তার প্রশংসা করা হোক। তাই, এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তোমার ভালো কাজের দিকে কেউ লক্ষ্য না করুক কিংবা কেউ কৃতজ্ঞতা না জানাক, কিন্তু আমি আল্লাহ তো তোমার ভাল কাজের সাক্ষী রইলাম এবং আমার কাছে তোমার কাজ লিপিবদ্ধ বা রেকর্ড হয়ে রইল। তবে কি তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করছ না? যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করে থাকো তবে কেন মানুষের কাছে প্রতিদানের আশা করছ? তাই মানুষের জানা উচিত, আল্লাহ তাদের সব কাজই দেখছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই হলো সৎকাজের মূল লক্ষ্য। কোরআনের ভাষায় দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের প্রতি উদাসীনতা ‌এক ধরনের জুলুম বা অন্যায়। জালেম লোকেরা বিচার দিবসে সব ধরনের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবে। দান করার ক্ষেত্রে যাকাতের মত ফরজ বা অবশ্য পালনীয় দান প্রকাশ্যে করা ভাল, কিন্তু মুস্তাহাব বা ইচ্ছাধীন দান গোপনে করা ভাল। সম্ভবত: এর যুক্তি হলো ফরজ বা অবশ্য পালনীয় কাজ করা সবারই দায়িত্ব এবং এতে সাধারণত: লোক দেখানোর প্রবণতা থাকে না এবং অন্যরা ফরজ আদায়ের ব্যাপারে সচেতন হয়।
 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-
প্রথমত : আল্লাহ আমাদের দানের খবর রাখেন। তাই সবচেয়ে ভালো সম্পদ থেকে আল্লাহর রাস্তায় দান করতে হবে এবং দানের উদ্দেশ্য হতে হবে সবচেয়ে মহৎ আর সবচেয়ে মহৎ উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
দ্বিতীয়ত : দান করতে হবে কখনো প্রকাশ্যে এবং কখনো গোপনে। প্রকাশ্য-দানে অন্যরা দান করতে উৎসাহী হয়। আর গোপনে দানের মাধ্যমে অহংকার ও নিজেকে জাহির করা থেকে দূরে থাকা যায়।
তৃতীয়ত : দান-খয়রাত হলো গোনাহ মাফ বা ক্ষমা লাভের একটি মাধ্যম। তওবা ও ক্ষমা লাভের জন্য অনেক সময় দান খয়রাত করা উচিত যাতে আল্লাহ আমাদের গোনাহ বা পাপ ক্ষমা করে দেন।

এরপর ২৭২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُونَ إِلَّا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ

 "হে নবী, তাদেরকে (মানুষকে) সৎপথে আনার দায় আপনার নয়। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। যে মাল তোমরা ব্যয় কর, তা নিজ উপাকারার্থেই কর। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যয় কর না। তোমরা যে, অর্থ ব্যয় করবে, তার পুরস্কার পুরোপুরি পেয়ে যাবে এবং তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।" (২:২৭২)

 

বিভিন্ন তাফসীরের বর্ণনায় দেখা যায়, মুসলমানরা দরিদ্র মুশরিকদের দান করার ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। যখন তাঁরা রাসুল (সঃ)- কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করল তখন এ আয়াত নাজেল হয়। এ আয়াতে বলা হয়েছে, জোর করে ধর্ম চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। তাই প্রকৃত মুসলমানের সাহায্য পাওয়ার জন্য মুসলমান হওয়ার সার্টিফিকেট দেখাতে হয় না। আল্লাহ যেমন এ পৃথিবীতে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সবাইকে জীবিকা ও অন্যান্য অনুগ্রহ দিয়ে থাকেন, তেমনি কোন প্রকৃত মুসলমান অভাবী ও দরিদ্রকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে কে মুসলমান ও কে অমুসলমান তা দেখেন না। কারণ, সব মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি বলে সাহায্য পাবার অধিকার রাখে। আর ইসলামের শত্রু নয় এমন দরিদ্র অমুসলিমদের সাহায্য করলেও বিচার দিবসে এর পূর্ণ প্রতিদান পাওয়া যাবে। ইসলাম মানব প্রেমের ধর্ম ও মানব দরদী ধর্ম।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো-
প্রথমত: ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা যাবে না, এমনকি নবীরাও কাউকে ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত: ইসলাম মানব সেবার ধর্ম। কোন অমুসলিমও দরিদ্র থাকুক ইসলাম তা চায় না।
তৃতীয়ত: কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে, তাহলে সে তার সৎ কাজের প্রতিদান পৃথিবীতে ও পরকালে অবশ্যই পাবে।

সূরা বাকারাহ'র ২৭৩ ও ২৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ

التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُمْ بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ (273) لَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ سِرًّا وَعَلَانِيَةً فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَناُونَ (274)

"দান ও সদকা এমন অভাবগ্রস্তদের প্রাপ্য,যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে জীবিকার সন্ধানে ঘোরা ফেরা করতে পারে না, তারা কিছু চায় না বলে অবিবেচক ব্যক্তিরা তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। কিন্তু তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের কাছে ব্যাকুলভাবে কিছু চায় না। তোমরা যা কিছু দান কর,আল্লাহ তা জানেন।" (২:২৭৩)
"যারা দিনে ও রাতে, গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজের সম্পদ থেকে দান করে,আল্লাহর কাছে তাদের পুরষ্কার রয়েছে, সুতরাং তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দানের জন্য দুঃখিত হবে না।" (২:৭৪)

এই দুই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, ইসলাম মুসলিম সমাজে ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব পরামর্শ দেয়, সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো,দান-খয়রাত করা। অর্থাৎ ইসলাম ধনী ও সম্পদশালীদেরকে তাদের সম্পদের কিছু অংশ দরিদ্র ও বঞ্চিতদের দান করতে বলে। এই আয়াতে দান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে,যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও হিজরতের কারণে সম্পদ হারিয়েছে এবং আয়-উপার্জনের কোন ক্ষমতাও যাদের নেই তাদেরকে যেন দান করা হয়। সংযমী হওয়ার কারণে এই শ্রেণীর মানুষ অন্যদের কাছে কিছু চায় না এবং নিজেদের অভাবের কথাও তুলে ধরে না। তাই সাধারণ মানুষ তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। কিন্তু মুমিনদেরকে এই সম্মানিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং এইসব দ্বীনি ভাইয়েরা যেন কষ্ট না পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবী (সাঃ)-র অনেক সহযোগী তাঁর সাথে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। মদীনায় তাদের ঘরবাড়ী,অর্থ-সম্পদ কিছুই ছিল না। কারণ,মক্কার মুশরিকরা তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ দখল করে নিয়েছিল। মদীনার মানুষ তাদের অনেককে নিজেদের ঘরে স্থান দেয় ও তাদের ব্যয়ভার বহন করতে থাকে। তবে মুহাজিরদের অধিকাংশই মসজিদে নববীর ‘সুফফাহ' নামক স্থানে আশ্রয় নেয়। এই দুই আয়াতে তাদের আভাব মোচনের জন্য মুমিনদেরকে আহবান জানানো হয়েছে ।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-
প্রথমত : ধনীদের সম্পদের মধ্যে আল্লাহ দরিদ্রদের অধিকার রেখেছেন।
দ্বিতীয়ত : মুসলিম সমাজে দরিদ্ররা তাদের অভাবের কথা বলার আগেই যেন তাদের অভাব মেটানো হয়। এতে করে মুমিনের সম্মান ক্ষুন্ন হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। মুসলিম সমাজে মুমিনের সম্মান ক্ষুন্ন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ।
তৃতীয়ত: যারা আল্লাহর রাস্তায় দান খয়রাত করে, আল্লাহ তাদেরকে ভবিষ্যতে দারিদ্র্য থেকে দূরে রাখবেন এবং তাদের কোনো ভয় নেই। কারণ, আল্লাহর ওপর ভরসা করার কারণে তারা নিজেদের দানের জন্য কখনও অনুতপ্ত বা দুঃখিত হবে না।

এরপর ২৭৫ ও ২৭৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

"যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তির মত দণ্ডায়মান হবে যাকে শয়তান স্পর্শদ্বারা পাগল করে দিয়েছে। তাদের এই অবস্থা এজন্য যে, তারা বলে,বেচা-কেনা তো সুদের মত! অথচ আল্লাহ বেচা-কেনাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে অবৈধ বা হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ আসার পর সে সুদ গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে অতীতে তার সুদ নেয়ার বিষয়টি আল্লাহ বিবেচনা করবেন। কিন্তু যারা পুনরায় সুদ নিতে আরম্ভ করবে, তারাই নরকের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে । (২:২৭৫)
"আল্লাহ সুদের আয়কে ধ্বংস করেন এবং দানকে বাড়িয়ে দেন , আল্লাহ অবিশ্বাসী বা অকৃতজ্ঞ পাপীদের ভালবাসেন না।" (২:২৭৬)

আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন, মহান আল্লাহ সুরা বাকারার পর পর ১৪টি আয়াতে মুমিনদেরকে দান খয়রাতে উৎসাহিত করেছেন এবং এর ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুফলেরও বর্ণনা দিয়েছেন। একদিকে দানশীলতার চেতনা শক্তিশালি করা ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমানো এবং অন্যদিকে শ্রেণী বৈষম্য হ্রাস করাসহ ইসলামী সমাজে ভ্রাতৃত্বের চেতনা জোরদার করা এসব আয়াতের মূল লক্ষ্য। আর এসব আয়াতের পর পবিত্র কোরআনে সুদ সমস্যার উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, সুদ সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করা ছাড়াও ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্যকেও নষ্ট করে। সুদের কারণে একদিকে ধনীদের বিরুদ্ধে গরীবদের ঘৃণা ও বিদ্বেষ বাড়তে বাড়তে তা বিস্ফোরণের পর্যায়ে উপনীত হয় এবং অন্যদিকে তা সুদখোরের মধ্যে এমন উন্মত্ততা সৃষ্টি করে যে, সে অর্থ ও স্বর্ণ ছাড়া আর কিছুই চেনেনা। এ ধরনের ব্যক্তি টাকার জন্য মানবিকতা পর্যন্ত বিসর্জন দেয়। সুদখোর সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোন ভূমিকা রাখে না। চিন্তা ও শ্রম না খাটিয়েই সে অভাবগ্রস্তকে ঋণ দিয়ে তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবী করে। এরফলে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হয় এবং ধনীরা আরো ধনী হয়। আর সমাজের বঞ্চিত শ্রেণীর ওপর এটা সবচেয়ে বড় ধরনের জুলুম। আর এ জন্যেই সমস্ত ঐশী গ্রন্থে সুদকে হারাম করা হয়েছে এবং সুদখোরদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। দৃশ্যত : সুদের মাধ্যমে অর্থের বৃদ্ধি, ও দান সদকার মাধ্যমে সম্পদ হ্রাস পেলেও সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি ও বরকত আল্লাহর ইচ্ছাধীন। সুদের মাধ্যমে যে অর্থ অর্জিত হয় তা ব্যক্তির জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে না। সুদের আয়ে বঞ্চিতদের ঘৃণা থাকে বলে সুদখোর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা পায় না এবং অনেক সময় তার আসল সম্পদও হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ দানশীল ব্যক্তি দানের জন্য সমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করায় নিরাপত্তা ও প্রশান্তি লাভ করে এবং তার উন্নতি ও কল্যাণের পথ প্রশস্ত হয়। 

এই দুই আয়াতে যা শিক্ষণীয় তার সার-সংক্ষেপ হলো-
প্রথমত : সুদ গ্রহণ ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং এরফলে সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়। সুদখোর ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা অর্জন করে এবং সুদ গ্রহণের কারণে সমাজে ন্যায়ের পরিবর্তে জুলুম ও নিপীড়নের বিস্তার ঘটে ।
দ্বিতীয়ত: ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ ধর্ম। তাই এ ধর্মে অর্থনৈতিক কর্মসূচিও রয়েছে। ইসলাম মানুষের ওপর নিস্প্রাণ ইবাদত চাপিয়ে দেয় না এবং পার্থিব বিষয়ে মানুষকে দিক-নির্দেশনা বিহীন ছেড়ে দেয়নি।
তৃতীয়ত : সুদ-গ্রহণ এক ধরনের অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ। আল্লাহ আমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা আল্লাহর দেয়া আমানত মাত্র। এ সম্পদ থেকে বঞ্চিতদের দান না করা হলো, আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এ অকৃতজ্ঞতা সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে।

এরপর ২৭৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآَتَوُا الزَّكَاةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

"যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠিত করে ও যাকাত দেয়, তারা আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবে। ভবিষ্যতের জন্য তাদের কোন আশঙ্কা নেই এবং ( অতীতের জন্যেও) তারা দুঃখিত বা অনুতপ্ত হবে না।" (২:২৭৭)

এই আয়াতে প্রকৃত মুমিনের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসী শুধু নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে না,তারা যাকাত দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির সাথেও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসীরা ধর্মকে প্রাণহীন শুষ্ক দায়িত্বের মধ্যে সীমিত করে না। তারা অন্যদের কল্যাণের জন্যেও সচেষ্ট থাকে।

সূরা বাকারাহ'র ২৭৮ ও ২৭৯তম আয়াতে বলা হয়েছে-

فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ

"হে বিশ্বাসীরা, আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদ বাবদ মানুষের কাছে যা তোমাদের পাওনা আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। (২:২৭৮) 
"আর যদি তা না কর, তবে ধরে নেয়া হবে যে, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ। যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের জন্যই তোমাদের মূলধন রয়েছে। তোমরা সুদ নিয়ে অত্যাচার করো না এবং মূলধন হারিয়ে অত্যাচারিতও হয়ো না।" (২:২৭৯)

পবিত্র কোরআনে যখন সুদ বর্জনের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন অনেক মুসলমানেরই সুদের অর্থ অন্যদের কাছে পাওনা ছিল। তাই তারা এ বিষয়ে রাসুলের কাছে প্রশ্ন করলে এই দুই আয়াত নাজেল হয় এবং নবী (সঃ) মুসলমানদের সমাবেশে সুদ সংক্রান্ত সকল চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন। রাসুল (সঃ) সবার আগে সুদের লেন দেন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য নিজের আত্মীয় স্বজনের প্রতি আহবান জানান। এর আগে কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে বঞ্চিতদেরকে অর্থ সাহায্য করা ও তাদেরকে ঋণ দেয়া আল্লাহকে ঋণ দেয়ার সমতুল্য। আর আল্লাহ নিজেই তাদের পুরস্কার দিবেন। এই আয়াতে সুদ নিয়ে বঞ্চিতদের ওপর জুলুম করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, যদি সুদ নেয়া থেকে বিরত না হও,তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল বঞ্চিতদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করবেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-
প্রথমত : ঈমান আনার অর্থ শুধু নামাজ পড়া ও রোজা রাখা নয়। অবৈধ সম্পদ থেকে দূরে থাকাও ঈমান ও তাকওয়ার শর্ত।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম মালিকানাকে সম্মান করে, কিন্তু সুদ গ্রহণ বা গরীব মানুষকে শোষন করার অনুমতি দেয় না।
তৃতীয়ত : অত্যাচার করা ও অত্যাচারিত হওয়া উভয়ই নিন্দনীয়। তাই সুদ দেয়া ও নেয়া দুটোই নিষিদ্ধ।
এরপর ২৮০ ও ২৮১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

"ঋণী যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তার সচ্ছলতার জন্য অপেক্ষা কর, আর যদি ঋণ ফেরত দেয়ার ক্ষমতাই না থাকে তাহলে তাদের ঋণ মাফ করে দেয়াই উত্তম। যদি তোমরা তা জানতে।" (২:২৮০)
"তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যে দিন তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, তখন যে যা অর্জন করেছে, তা সম্পূর্ণরূপে দেয়া হবে এবং তোমাদের ওপর অন্যায় করা হবে না।" (২:৮১)

দানখয়রাত ও ঋণ দেয়ার জন্য মুমিনদেরকে উৎসাহিত করার পর,সুদ না নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, ঋণ দেয়ার পর সুদ নেয়া তো চলবেই না, একই সাথে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি যদি স্বল্প সময়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা না রাখে , তবে তাকে সময় দেয়া উচিত , এমনকি যদি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাই না রাখে, তাহলে ঋণ মাফ করে দেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে। ঋণ মাফ করে দেয়ার জন্য পরকালে প্রতিদান দেয়া হবে বলেও আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। ধর্মের এইসব উপদেশ যদি সমাজে বাস্তবায়িত হত তাহলে সমাজে সচ্ছলতা পবিত্রতা ও ভ্রাতৃত্ব কতই না বৃদ্ধি পেত। এর ফলে অভাবগ্রস্তদের অভাব পূর্ণ হওয়া ছাড়াও ধনীরা লোভী কৃপণ ও দুনিয়াপূজারী হতে পারতো না এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধানও হ্রাস পেত।

এবারে এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক গুলো হলো, 
প্রথমত : বঞ্চিতদের কল্যাণ সাধন করাই দান খয়রাত ও ঋণ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য। তাই এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে গরীব আরো অভাবগ্রস্থ হয়ে পরে।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম বঞ্চিতদের প্রকৃত সহায়। তাই সুদকে নিষিদ্ধ করে এবং দানকে উৎসাহিত করে ইসলাম সমাজের অর্থনৈতিক শূন্যতা পূরণ করেছে।
তৃতীয়ত : দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করা, সম্পদ অর্জনের চেয়ে ভালো।
এরপর আল্লাহ পাক এই সূরার ২৮২ নম্বর আয়াতে বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ وَلْيَكْتُبْ بَيْنَكُمْ كَاتِبٌ بِالْعَدْلِ وَلَا يَأْبَ كَاتِبٌ أَنْ يَكْتُبَ كَمَا عَلَّمَهُ اللَّهُ فَلْيَكْتُبْ وَلْيُمْلِلِ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا يَبْخَسْ مِنْهُ شَيْئًا فَإِنْ كَانَ الَّذِي عَلَيْهِ الْحَقُّ سَفِيهًا أَوْ ضَعِيفًا أَوْ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يُمِلَّ هُوَ فَلْيُمْلِلْ وَلِيُّهُ بِالْعَدْلِ وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِنْ رِجَالِكُمْ فَإِنْ لَمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ أَنْ تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكِّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى وَلَا يَأْبَ الشُّهَدَاءُ إِذَا مَا دُعُوا وَلَا تَسْأَمُوا أَنْ تَكْتُبُوهُ صَغِيرًا أَوْ كَبِيرًا إِلَى أَجَلِهِ ذَلِكُمْ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ وَأَقْوَمُ لِلشَّهَادَةِ وَأَدْنَى أَلَّا تَرْتَابُوا إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ وَلَا يُضَارَّ كَاتِبٌ وَلَا شَهِيدٌ وَإِنْ تَفْعَلُوا فَإِنَّهُ فُسُوقٌ بِكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (282

 
"হে বিশ্বাসীগণ, যখন একে অন্যের সাথে কোন নির্দিষ্টকালের জন্য ঋণ সংক্রান্ত আদান প্রদান করবে তখন তা লিখে রাখ এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয়, যেহেতু আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন তাই লেখক যেন লিখতে অস্বীকার না করে। এবং ঋণ গ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্রও কম-বেশী না করে। আর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে অক্ষম হয়, তবে তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখাবে। দুজন পুরুষকে সাক্ষী করবে, যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে নিজেদের পছন্দ মত একজন পুরুষ ও দুজন মহিলাকে (সাক্ষী করে নেবে)। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে একজন যদি ভুলে যায়, তবে অপর জন তা স্মরণ করিয়ে দিবে। যখন সাক্ষীদেরকে ডাকা হয়, তখন যেন তারা অস্বীকার না করে। দেনা কম হোক আর বেশি হোক মেয়াদ পর্যন্ত তা লিখতে অলসতা কর না, এ লিপিবদ্ধ করণ আল্লাহর কাছে সুবিচারকে অধিক কায়েম রাখে, সাক্ষ্যকে অধিক সুসংহত রাখে এবং তোমাদের সন্দেহে পতিত না হওয়ার পক্ষে অধিক উপযুক্ত। কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পরস্পর হাতে হাতে আদান-প্রদান কর, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন পাপ নেই। তোমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় সাক্ষী রাখ। কোন লেখক ও সাক্ষীকে (চাপ প্রয়োগ) ক্ষতিগ্রস্ত করো না। যদি তোমরা এ ধরনের কিছু কর, তবে তা তোমাদের পক্ষে পাপের বিষয়। আল্লাহকে ভয় কর তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন।" (২:২৮২)
 

সুরা বাকারার এই আয়াতটি পবিত্র কোরআনের দীর্ঘতম আয়াত। মানুষের অর্থ সম্পদ রক্ষার বিষয়ে এতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দান খয়রাত করা ও ঋণ দেয়ার উপদেশ সম্পর্কিত আয়াত এবং সুদ নেয়া নিষিদ্ধ ঘোষণার পর এই আয়াতে লেনদেনের সঠিক পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে মানুষকে লেনদেনের ক্ষেত্রে সব ধরনের ভুল ও অন্যায় থেকে দূরে রাখা যায় এবং কোন পক্ষই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। লেনদেনের সঠিক পদ্ধতির যেসব শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, এবারে তা সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
প্রথমত : যে কোন ধর্মাবলম্বীর সাথে বেশী বা কম অর্থের ঋণ বা অন্য কোন ধরনের লেনদেন করা হোক না কেন তা দলীল আকারে লিখে রাখা উচিত।
দ্বিতীয়ত : কোন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দলীল লেখাতে হবে। তা-না হলে দেনার দায় লেখকের ওপর চাপানোর ভয় থাকে।
তৃতীয়ত : লিখিত প্রমাণ ছাড়াও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য দু'জন সাক্ষী থাকতে হবে।
পঞ্চমত : নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিত দলীল জরুরী নয়। সাক্ষীই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।

এবারে সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় কিছু দিক তুলে ধরছি।
প্রথমত : ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামাজিক ধর্ম। ব্যক্তিগত দিক ও মানুষের আত্মিক বিকাশ ছাড়াও এ ধর্মে সমাজের অর্থনৈতিক এবং আইনগত বা অধিকারগত বিষয়ের ওপর গভীর দৃষ্টি দেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত : লেনদেনের চুক্তি লিখে রাখার কথা বলা হয়েছে এমন এক সময়ে যখন সাধারণ মানুষ লেখাপড়া জানতো না। আর এ থেকেই বোঝা যায় শিক্ষা ও জ্ঞানের উন্নতির প্রতি ইসলাম ধর্ম গুরুত্ব আরোপ করে।
তৃতীয়ত : চুক্তিপত্র লিখতে বলার উদ্দেশ্য হলো, জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টি করা। অবিশ্বাস সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য নয়। ভুল করা , ভুলে যাওয়া বা অবহেলা করা সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিনষ্ট করে।

সূরা বাকারাহ'র ২৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

وَإِنْ كُنْتُمْ عَلَى سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَانٌ مَقْبُوضَةٌ فَإِنْ أَمِنَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا فَلْيُؤَدِّ الَّذِي اؤْتُمِنَ

أَمَانَتَهُ وَلْيَتَّقِ اللَّهَ رَبَّهُ وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آَثِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

"আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে (নগদ নয় এমন লেনদেনের ক্ষেত্রে বা ঋণ-প্রদানের ক্ষেত্রে)কিছু বন্ধক রাখা বৈধ। আর যদি তোমরা পরস্পরকে বিশ্বাস কর,তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়,সে যেন (বিশ্বাস বজায় রেখে)গচ্ছিত দ্রব্য বা আমানত ফিরিয়ে দেয় এবং নিজ প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে নিশ্চয়ই তার অন্তর পাপপূর্ণ। তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।" (২:২৮৩)

ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে কোন পক্ষের ভুল বা স্মৃতি বিভ্রাটের কারণে সমস্যা দেখা না দেয় সেজন্যে লিখিত দলীল রাখার পরামর্শ দেয় ইসলাম। এ বিষয়ে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে,সফরের সময়ও লেনদেনের দলীল লিখে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- যদি কোন লেখক না পাওয়া যায় তাহলে কোন কিছু গচ্ছিত রেখে লেনদেনকে সুদৃঢ় করতে হবে। এই গচ্ছিত আমানত আল্লাহকে স্মরণ রেখে মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আয়াতের শেষাংশে মুমিন মুসলমানদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে কথা বলতে বা সাক্ষ্য দিতে কেউ যেন অবহেলা না করে কারণ,আল্লাহ মানুষের অন্তরের খবর রাখেন এবং কেউ যদি কারো অধিকারের ব্যাপারে নীরব থাকে বা অধিকার গোপন রাখে, তাহলে তা হবে অত্যন্ত বড় পাপ। 
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলোঃ
এক. নগদ নয় এমন সব লেনদেন মুখের কথার ভিত্তিতে করা উচিত নয়। বরং লিখিত প্রমাণ রেখে স্বাক্ষী রেখে ও প্রয়োজন হলে বন্ধক বা জামানত রেখে লেনদেন সুদৃঢ় করা উচিত।
দুই. সমাজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে সময় মত দেনা পরিশোধের মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট রাখতে হবে।

এরপর ২৮৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللَّهُ فَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

"আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সমন্ত আল্লাহর,তোমাদের অন্তরে যা আছে,তা প্রকাশ কর অথবা গোপণ রাখ,আল্লাহ তার হিসেব তোমাদের কাছ থেকে গ্রহণ করবেন। এরপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। বস্তুত আল্লাহ সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।" (২:২৮৪)

এই আয়াতে বিশ্বাসীদের সাবধান করে দিয়ে বলা হয়েছে- আল্লাহ অন্তরের পাপ সম্পর্কেও অবহিত এবং অন্তরের পাপ অনুযায়ী আল্লাহ তোমাদের বিচার করবেন। কিন্তু শয়তান যদি মানুষের অন্তরে খারাপ কাজের কূ-মন্ত্রণা দেয় এবং মানুষ যদি খারাপ কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও ঐ কাজে জড়িত না হয়, তাহলে সে জন্য শাস্তি পাবেনা। অবশ্য পাপের চিন্তা বা ইচ্ছা, ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে অন্ধকার ও কলুষিত করে এবং পাপের পথ খুলে দেয়।

এরপর ২৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

آَمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

"রাসুল, তাঁর প্রতি তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে সে বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং বিশ্বাসীরাও আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ,তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের ওপর বিশ্বান স্থাপন করেছে। তাঁরা বলেন , আমরা আল্লাহর রাসুলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করিনা , তাঁরা বলে, আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই এবং তোমারই কাছে আমরা ফিরে যাবো।" (২:২৮৫)

ইসলামের দৃষ্টিতে, বিশ্ব একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত। নবীগণ মানবজাতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করেছেন। মানুষের চিন্তা ও বিবেক যখন আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী উপলদ্ধি করার যোগ্য হ'ল,তখন আল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সঃ )কে মানবজাতির জন্য সর্বশেষ নবী হিসেবে মনোনীত করেন। তাই একজন মুসলমান সমন্ত নবী ফেরেশতা ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রেরিত সমস্ত গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং তাঁরা নবীদের মধ্যে কোন বৈষম্য করে না।

এরপর এই সুরার ২৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

"আল্লাহ কাউকেই তার সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব দেন না। ভালো এবং মন্দ যে যা উপার্জন করবে সে তারই প্রতিদান পাবে। (বিশ্বাসীরা বলে)হে আমাদের প্রতিপালক!যদি আমাদের ভুল ত্রুটি হয়,তবে আপনি আমাদের অপরাধী করবেন না,হে আমাদের প্রতিপালক!আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেমন গুরুভার অর্পন করেছিলেন, আমাদের ওপর তেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করবেন না। যে ভার সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের নেই,তা আমাদের ওপর আরোপ করবেন না। আমাদের কে ক্ষমা করুন, আমাদেরকে দয়া করুন,আপনিই আমাদের অভিভাবক। তাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের জয়যুক্ত করুন।" (২:২৮৬)

মহান আল্লাহতা'লা মানুষকে বিভিন্ন গুণ ও যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কেউ বেশী প্রতিভাবান, কেউ কম প্রতিভাবান, কেউ শক্তিশালী ও সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী। আবার কেউ দুর্বল ও রুগ্ন। কেউ ফর্সা, কেউ কালো এবং কেউ নারী ও কেউ পুরুষ। এসবের মধ্যে কোন কোন পার্থক্য মানব প্রজন্ম সৃষ্টি ও রক্ষার জন্য জরুরী। আবার কোন কোন পার্থক্য বা বৈষম্য মানুষের ওপর জুলুম ও সামাজিক অবিচারেরই ফল মাত্র। এটা স্বাভাবিক যে, এই সব পার্থক্য ও বৈষম্য মানুষের শরীর এবং মনের ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখে। মানুষের মধ্যে এতসব পার্থক্য সত্ত্বেও আল্লাহ যদি তাদের কাছ থেকে একই ধরনের প্রত্যাশা রাখেন, তবে তা হবে অবিচার। তাই এ আয়াতে আল্লাহর অন্যতম প্রধান গুন হিসেবে তাঁর ন্যায়পরায়নতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ কাউকে তার ক্ষমতা বা সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব দেন না এবং তার কাছে এর চেয়ে বেশী প্রত্যাশা ও করেন না। তাই শাস্তি ও পুরস্কার দায়িত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলোঃ
১. ইসলাম সহজ সরল ধর্ম। ইসলাম সাধ্যের চেয়ে বেশী দায়িত্ব পালন করতে বলে না। যেমনটি ইসলামের নবী (সাঃ)ও বলেছেন, আমি সহজ ও সরল ধর্মের নবী মনোনীত হয়েছি।
২. পুরস্কার ও শাস্তির ভিত্তি হলো, কাজ বা তৎপরতা। আর কাজ করা হয় ইচ্ছার ভিত্তিতে। তাই ভুল করে যেসব অপরাধ করা হয় সেগুলোর জন্য আল্লাহ শাস্তি দেবেন না।
৩ : আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়ালু , করুণাময় এবং ক্ষমাশীল। তাই মানুষ তওবা করলে আল্লাহ তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন এবং পাপের কালিমা থেকে তাদেরকে পবিত্র করেন।