‘সফট পাওয়ার', তা বলিউডই হোক বা ‘আইটি স্কিল' – ভারতীয়দের এক্ষেত্রে জুড়ি মেলা ভার৷ অ্যামেরিকার ‘সিলিকান ভ্যালি' তো বটেই, এই সফট পাওয়ার এখন ছেয়ে গেছে জার্মানিতেও৷ যারা জার্মান বিয়ার ও সসেজ যেমন ভালোবাসে, ভালোবাসে ফুটবলও৷

২০০৯ সাল৷ বিশ্বখ্যাত ‘ট্রেড' সম্মেলনে ভারতীয় ‘সফট পাওয়ার'কে দেশটির অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সাফল্যের চাবিকাঠি বলে অবহিত করেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর৷ সে'দিন তাঁর ঝকঝকে ইংরেজি এবং ভবিষ্যতধর্মী বক্তব্যে সকলের তাক লেগে গেলেও, একথা মানতেই হয় যে তথ্য প্রযুক্তির বাজারে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ভারত৷ সামরিক শক্তি বা পেশি শক্তি নয়, তথ্য প্রযুক্তি, বলিউড, জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিকের মতো পণ্য বা পরিষেবা দিয়ে মানুষের মন জয় করা অনেক সহজ – এমনটাই মনে করেন শশী থারুর৷ তাই একে ‘সফট পাওয়ার' বলা হয়ে থাকে৷

জেনারেল ইলেকট্রনিকস, বোয়িং ও সিটি ব্যাংকের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কম দামে তথ্য প্রযুক্তি সেবা সরবরাহ করে আজ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে দেশটি৷ সংখ্যার বিচারে প্রায় আড়াইশ'র মতো কোম্পানি এখন ভারতের আইটি ফার্মগুলির সেবা-গ্রহীতা৷ জার্মানির প্রধান ব্যাংক ‘ডয়চে ব্যাংক'ও ভারত থেকে কর্মী নিয়ে এসেছে তাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট অফিসের জন্য৷ তাঁদেরই অন্যতম অর্ণব গুহ, যিনি এ মুহূর্তে ডয়চে ব্যাংক'এর ‘গ্লোবাল মেসেজিং অপারেশনস'-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘এখানে সাধারণত ব্যাংকের যে সমস্ত ট্রানস্যাকশনস হয়, ইলেকট্রনিক্স বা ক্রস বর্ডার...মানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে আমরা যখন পার্টনারদের টাকা পাঠাই, সেই ট্রানস্যাকশনগুলো কিছু মিডিয়া বা অ্যাপলিকেশন ব্যবহার করে হয়৷ সেই সব অ্যাপলিকেশনগুলো নিয়েই আমাদের কাজ৷ যার বিজনেস বা আইটি'র দিকটা আমাদের দেখতে হয়৷ তবে আমি বিশেষভাবে কাজ করি এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর৷''

কিন্তু এখানেই শেষ নয়৷ গত কয়েক বছরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মূলত ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সে ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি সেবার বাজার তৈরি হয়েছে৷ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ'ভুক্ত দেশগুলোয় ভারতের টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস বা টিসিএস'এর কম করে হলেও এক হাজার কর্মী কাজ করছেন৷ এছাড়া, প্রবৃদ্ধির উচ্চ হারে আকৃষ্ট হয়ে অনেক বিদেশি কোম্পানিই এখন ভারতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর দিকে মনযোগী হচ্ছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের টেকনো জায়েন্ট আইবিএম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কর্মী ছাঁটাই করে ভারতে সেই সংখ্যা বাড়াচ্ছে৷ আবার জার্মান সফটওয়ের নির্মাতা এসএপি বা স্যাপ জার্মানিতে কর্মরত ভারতীয় কর্মীদের সংখ্যাও উন্নীত করেছে৷

অর্ণবের কথায়, ‘‘আইটি'র যে সমস্ত লোক এখন এখানে কাজ করছে, তাদের অন্তত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভারতীয় কোনো কোম্পানির কর্মচারি৷ মানে ভারতীয় কোনো কোম্পানির ‘ক্লায়েন্ট' হিসেবে কাজ করছে তারা৷ যেমন ধরুন, কলকাতার টিসিএস কোম্পানিতে কেউ যখন কাজ করছে, আদতে কিন্তু সে জার্মানির লুফৎথানসা কোম্পানির হয়ে কাজ করছে৷ অর্থাৎ, লুফৎথানসা এখানে টিসিএস'এর ক্লায়েন্ট৷ তবে আরো একটা পপুলেশন রয়েছে যারা জার্মানিতে পুরোপুরি ‘রিলোকেট' করে গেছে৷ অর্থাৎ, তারা জার্মানিতেই কাজ করছে৷ এখানেই তারা ‘সেটেল্ড' এবং এখানকার কোনো কোম্পানিতে কাজ করছে তারা৷ যেমন সিমেন্স, ফল্কসভাগেন বা এসএপি'তে৷''

গত সাত বছর ধরে ডয়চে ব্যাংক'এ কাজ করলেও, মাত্র এক বছর আগে জার্মানিতে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেছেন অর্ণব গুহ৷ তাঁর মতে, এখানকার শ্রমিক ইউনিয়ন বা ওয়ার্কার্স কাউন্সিল অনেক বেশি শক্তিশালী৷ জার্মানিতে হিউম্যান রিসোর্সেস বা কাজের সঙ্গে পারসোনাল ব্যালেন্সটা খুব ভালোভাবে দেখা হয়৷ তাই কেউ যদি এখানে এসে দু-তিন বছর থেকে এখানকার কর্ম পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়, তখন তার ভারতে গিয়ে সেখানকার কাজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হবে৷

আর তাই, ইউরোপ তথা জার্মানিতে পাকাপাকিভাবে চলে আসা ভারতীয়দের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমশই৷ অবশ্য এর একটা অন্য কারণও আছে৷ অর্ণব জানান, ‘‘প্রযুক্তি এবং স্পেশালাইজড স্কিল'এ ভারতীয়রা এগিয়ে আছে৷ এছাড়াও এক্ষেত্রে যে জিনিসটা কাজ করছে সেটা হলো শ্রমমূল্য৷ আমি একজনকে এখানে রেখে, এখানকার কোনো কোম্পানিতে নিয়োগ দিয়ে যদি কাজ করাই, তাতে আমার যে খরচ পড়বে তার থেকে তাকে যদি আমি ‘আউট সোর্স' করে অন্য কোনো কোম্পানিকে দিয়ে দেই, অর্থাৎ স্মার্ট সোর্সিং ফাঙ্কশন ব্যবহার করি এবং সেই সূত্রে যদি তারা বাইরে আসে তাহলে আমাদের খরচটা বেশ কম পড়ে৷ অথবা এখান থেকে কোনো কাজ ভারতে নিয়ে গিয়ে করলে বা ‘অফশোর' করলেও কস্ট বা খরচ কম পড়ে খানিকটা৷''

বলা বাহুল্য শুধু ভারত নয়, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার যে কোনো দেশেই কাজের পরিবেশ বা ওয়ার্কিং কালচারটা একটু আলাদা৷ অনেক দীর্ঘ সময় সেখানে কাজ করতে হয়৷ তাছাড়া জার্মান ছাড়া জার্মানিতে চলবে না, একথাও আর বলা যায় না৷ এমনটাই অভিমত অর্ণব গুহ'র৷ তিনি বলেন, ‘‘জার্মানি আগের থেকে অনেক বেশি কস্মোপলিটান হয়ে উঠেছে৷ এই ফ্রাঙ্কফুট শহরটাই ধরা যাক৷ এখানে এতগুলো দেশের লোকজন রয়েছে যে, জার্মান ছাড়াও এখানে কাজ চলে যায়৷ মানে ওয়ান ক্যান সারভাইভ উইদাউট জার্মান, অ্যাটলিস্ট ইন দ্য কর্পোরেট অ্যাটমস্ফিয়ার৷ বেশিরভাগ কোম্পানি বা ব্যাংকই এখানে গ্লোবাল বিজনেস করছে৷ তাই ইংরেজিটাই কার্যক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে৷ সুতরাং আজ থেকে দশ বছর আগে জার্মানিতে এলে ভাষা সংক্রান্ত যে ধরণের সমস্যাগুলি হতো, সেটা কিন্তু ফ্রাঙ্কফুর্ট'এর মতো একটা বিজনেস ক্যাপিটেল'এ আর হচ্ছে না৷''

এরপরেও অবশ্য জার্মান সমাজ, সেখানকার মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হলে ভাষার প্রযোজনীয়তাকে এড়ানো যায় না কোনোভাবে৷ আর সেটা বিয়ার, সসেজ আর ফুটবলভক্ত অনেক ভারতীয়ই স্বীকার করছেন আজ-কাল৷ অর্ণব গুহ'ও তার ব্যতিক্রম নন৷ ডয়চে ভেলে থেকে সংগৃহীত।

অনলাইন ডেস্ক