মানবিকতা একটি শব্দ, যা সব মানুষেরই কম-বেশি আছে। তাই সারা পৃথিবী আজ একসূত্রে বাঁধা পড়ে আছে শুধু মানবিকতার টানে। করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীর মানুষকে একত্র করেছে শুধু মানবিকতা দিয়ে।

আর এ ক্ষেত্রে কাজ করেছে শুধু একটি ধর্ম—মানবধর্ম। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আস্তিক, নাস্তিক, সাদা, কালো, ধনী, দরিদ্র, আমেরিকা, চীন, উন্নত-অনুন্নত দেশ, নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধনির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। আমরা সবাই একই বিশ্বের একই বাতাসে এখনো শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছি; মৃত্যু হতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। করোনা ভাইরাস যেকোনো মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারে আমাদের যে কারও প্রাণ।

আয়ারল্যান্ডে করোনার এ মহাদুর্যোগের সময় সরকারি দল বিরোধী দল এবং লোকাল গভর্নমেন্ট যেমন স্থানীয় কাউন্টি কাউন্সিল সিটিজেন এবং স্থায়ী রেসিডেন্টদের মহামারী পরিস্থিতিতে ভাতা দিয়ে যাচ্ছে। তেমনি আমরাও কমিউনিটির পক্ষ থেকে একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি সাধ্যমতো।

তবে বিপাকে পড়েছেন এখানকার ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট এবং অনিয়মিত অভিবাসীরা যারা আইরিশ রাজস্ব বিভাগে নিবন্ধিত না হয়ে ক্যাশ এন্ড হেন্ড কাজ করছিলেন। নিয়মনীতির ছকে পড়ে তাঁরা সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো তো পাচ্ছেনই না, বরং ভীষণ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এরা পড়েছেন মারাত্মক আর্থিক কষ্টের মধ্যে। এরা যেসব পার্টটাইম জব করতেন তার সবই মোটামুটি বন্ধ। আমাদের অনেকেরই ধারণা, ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা সবাই ধনীর দুলাল, ওদের সম্পূর্ণ খরচ দেশ থেকেই আসে। আসলে কিন্তু তা নয়, অধিকাংশ ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট মা-বাবার সঞ্চয় আর ধার-দেনার টাকায় এখানে আসেন এবং এখানে কাজ করেই তাদের খরচের অনেকটাই চালাতে হয়। অনিয়মিত অভিবাসীদের সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা, তারা দেশে অনেক টাকার মালিক, এখানে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে রিফিউজি ক্লেইম করেছে। এ ধারণাটিও সঠিক নয়। আয়ারল্যান্ড সম্প্রতি রিফিউজিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল । ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা যেমন একদিকে আয়ারল্যান্ডের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রার উৎস, তেমনিভাবে আজকের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা কালকের যোগ্য পারমানেন্ট রেসিডেন্ট। রিফিউজি ও ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা আয়ারল্যান্ডের শ্রমবাজারেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন এবং আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতিকে সচল রাখেন।

ইউনিভার্সিটির ক্লাস এবং ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার পর বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য যে বড় অঙ্কের ডিপোজিট দিতে হয়, তা অনেক ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট ও অবৈধ নাগরিকদের পক্ষে সম্ভব নয়।

বাড়িওয়ালা হিসেবে এই মুহূর্তে আপনি এই ডিপোজিট না নিয়ে আপনার পরিবারের খাবার ওদের সঙ্গে শেয়ার করুন, পারলে তাঁদের আর্থিকভাবেও সাহায্য করুন, সেটিই তো আসল ধর্ম, আসল মানবতা, প্রকৃত আইরিশদের মতো কাজ। খোঁজ নিন তাঁরা সুস্থ আছে কি না, প্রয়োজনে ডাক্তার দেখাতে পারছে কি না, ওষুধ কিনতে পারছে কি না।

ভালো থাকুন সবাই, দেশে-বিদেশ যেখানেই থাকুন। ঘরে থেকেই আমরা সারা বিশ্বে সবার জন্য আমাদের সাহায্যের হাত বাড়াই, আমরা সবাই আলাদা থেকেই একত্র থাকি। জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানবতার।

আলী হুসাইন
স্লাইগো, আয়ারল্যান্ড