হউক জীবন সংশয় কিংবা জীবিকার সন্ধান যে উদ্দেশ্যেই দেশান্তরীত হইনা কেন আমরা প্রত্যেকেই বেছে নিয়েছি প্রবাসী জীবন। ভিন্ন দেশে ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেয়াটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাশাপাশি ইমিগ্র্যান্ট বান্ধব সরকারী নীতিমালাগুলোও এদেশে বসবাসরত নন ইউরোপীয়ানদের জীবনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৬ সালের রিপোর্ট অনুসারে এদেশে বৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসনকারীর (ইমিগ্র্যান্ট) সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসনকারী আছেন ৬০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লক্ষের মতন। ইউরোপীয়ানরা এদেশে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকে এটা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের নাগরিক সুরক্ষা আইনের কারণে, তাদের গায়ের রং, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে সাদৃশ্য থাকার কারণে। ইউরোপীয়ান দেশগুলোর মধ্যে অবাধ যাতায়াত ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকার কারণে আমাদের মতন তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়না। সমস্যা পোহাতে হয় আমাদের মতন, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যেও দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত নাগরিকদের। আমরা অনেক ক্ষেত্রে কড়া ইমিগ্রেশন নীতিমালার কারণে কোণঠাসা হয়ে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতন নির্জীব জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। আমাদের মতন ইমিগ্রান্টদের পায়ে পায়ে বন্দুকের নল, পলাতক ছায়ার পিছনে গোয়েন্দার সার্চ লাইট। আমরা কি করছি, কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে মিশছি আমাদের অজান্তেই সবকিছুর উপর নজরদারি করা হয়। যেন আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের উপর তাদের খবরদারি করার অলিখিত অনুমতি দিয়ে দেয়া হয়েছে।

এদেশে অনিয়মিত হয়ে পড়া হাজার হাজার অভিবাসীদের মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে যারা নিয়মিত হতে পেরেছেন তারা জীবন ব্যবস্থায় পদে পদে আতংকগ্রস্থ থাকেন কখন ভুলবশত কোন আইন লংঘন করে ফেলেন শেষে কিনা নাগরিকত্ব আবেদনে অযোগ্য বিবেচিত হন। নিজ দেশে বিয়ে করে রেখে আসা প্রিয় মানুষটির জন্য আবেদন করেছেন আয়ারল্যান্ড নিয়ে আসবেন, বছরের পর বছর আবেদনটি পড়ে রয়েছে কোন সারা শব্দ নেই, দু'জন প্রতিশ্রুতিশীল মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ফাইল বন্ধি করে রাখা হয়েছে, অবহেলা করা হচ্ছে, তাদের বৈবাহিক বন্ধনকে দূরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আবার আইরিশ ন্যাচারালাইযেশন বা নাগরিকত্ব সনদের জন্য আবেদন করবেন সেখানেও দীর্ঘসুত্রতা, অপেক্ষমান মানুষের তালিকা অনেক লম্বা, দুই বছর, তিন বছর ধরে হাজার হাজার মানুষ প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল যে বছর আইরিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেন সেই বছর আয়ারল্যান্ডের বাহিরে ভ্রমণ করতে পারবেননা পুরো ৩৬৫ দিন। যদি তাই করেন তাহলে আপনি নাগরিকত্ব আবেদনের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। কি অমানবিক নিয়ম নিয়ে আসা হয়েছে, ধরুন দেশে আপনার কোন নিকট আত্নীয় বা পরিবারের সদস্যের মৃত্যু ঘটল তখন আপনাকে বেছে নিতে হবে যেকোন একটি সীদ্ধান্ত, হয় দেশে যাবেন, দেশ থেকে এসে পরের বছর আবেদন করবেন নতুবা আইরিশ নাগরিকত্বের জন্য স্বজন বিয়োগের দুঃখ অন্তরে চাপা রেখে থেকে যাবেন এই দেশেই। দুর্গতি আরও আছে আপনার আইরিশ নাগরিকত্ব আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আপনি হয়তো নিজে থেকে কোথাও যেতে চাইবেননা আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য। আপনার আমার জীবন যেখানে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত সেখানে রাষ্টীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আমাদের ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে, প্রতিনিয়ন আমাদের মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই সমূহ কুটিল নিয়মনীতির খপ্পরে পড়ে আমরা যখন হাপিয়ে উঠি তখন মৌন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেই কিছু উক্তি "আইরিশরা বর্ণবাদী, তারা আমাদের পছন্দ করেনা"।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, এসবকিছুর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। নিজেরা হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকলে হঠাৎ দৈবলোক থেকে কোন স্বর্গদ্রুত এসে আমাদের সকল সমস্যা সমাধান করে দিবে না। আমাদের নিজেদের পথ নিজেদেরই বাতলে নিতে হবে। আমরা যতটা না দেশীয় রাজনীতি নিয়ে তৎপর ঠিক ততটাই এদেশের মূলধারার রাজনীতি নিয়ে অনাগ্রহী। সকল মাইগ্রান্ট কমিউনিটির মধ্যে আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যেহেতু সকল মাইগ্রান্ট কমিউনিটির, লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও স্বার্থ অভিন্ন তাই আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। স্বস্তা জনপ্রিয়তার নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বৃহৎ পরিসরে সকল মাইগ্রান্ট কমিউনিটির সম্মিলিত প্রয়াস কে পুঁজি করে সামনের পথটুকু পাড়ি দিতে হবে।

স্থানীয় সরকার কিংবা জাতীয় সংসদে মাইগ্র্যান্ট প্রতিনিধি থাকা সময়ের দাবী।

কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদারের ভাষায় যদি বলি,

কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভু আশীবিষে দংশেনি যারে

স্থানীয় আইরিশরা কখনো আমাদের ইমিগ্রান্টদের মনের ভাষা বুঝবেন না, কেননা তারা কখনো আমাদের মতোন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাননি। একমাত্র ইমিগ্রান্টরাই বুঝবে ইমিগ্রান্টের ব্যাথা।

ইমিগ্রান্ট কাউন্সিলের পরিসংখ্যান ঘাটালে দেখা যায় গত মে ২০১৯ স্থানীয় কাউন্সিল নির্বাচনে ১৯০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৬ জন বিভিন্ন মাইগ্রান্ট কমিউনিটি থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন। মোট ৯৪৯ জন স্থানীয় কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তাদের মধ্যে মাইগ্রান্ট কমিউনিটির প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৯ জন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জরিপ পরিচালনা করা হয় সেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এসব মাইগ্রান্ট প্রার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তাদের অনেকেরই স্থানীয় কমিউনিটির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলনা আবার অনেকেই রাজনীতির ময়দানে অনভিজ্ঞ ছিলেন। অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন কিন্তু রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হবার উপায় জানা ছিলনা। অনেক মাইগ্রান্ট কমিউনিটির প্রার্থী অন্য মাইগ্রান্ট কমিউনিটি থেকে আশানুরূপ সাহায্য সহযোগিতা পাননি।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ
লেখাটি সময় নিয়ে পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। ইন্টার কালচারাল প্লাটফর্মের একজন একটিভিস্ট হিসেবে মাইগ্রান্ট কমিউনিটির সমস্যা নিয়ে লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্যগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি সাথে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিমতও জুড়ে দিয়েছি। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠণমূলক মন্তব্যের জন্য অগ্রীম স্বাগতম।

ওবায়দুর রহমান রুহেল
স্টীয়ারিং গ্রুপ মেম্বার
ডুনেগাল ইন্টার কালচারাল প্লাটফর্ম

বার্তা সম্পাদক
আইরিশ বাংলা বার্তা