জামায়াত সবসময় ফাঁদ পেতে রাখে, যেমন তারা রেখেছিল একাত্তরে। এখন ফাঁদ পেতে রেখেছে বড় দুই দলের জন্য। সেই ফাঁদের একটাতে পা দিয়েছে বিএনপি। অন্যটি ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য। কিন্তু সেটা সহজে কব্জা করতে পারেনি তারা। জামায়াতের পরিকল্পনাটাই হচ্ছে দেশে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা।

সংঘাতময় পরিস্থিতি সাধারণত শাসকদলকে কিছুটা বিভ্রান্ত করে ফেলে। এ বিভ্রান্তির সুযোগে কিছু ভুল পদক্ষেপও হয়ে যায়। আর এই ভুল পদক্ষেপকে পুঁজি করেই বিরোধী রাজনীতির কর্মসূচি দানা বেঁধে ওঠে।

জামায়াত গত তিনবছর যাবৎ একটা আন্দোলন দাঁড় করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেটা বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তব্যের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি নিয়ে গত ৩ বছর ধরে সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপও সৃষ্টি হচ্ছিল। যারা অভিযুক্ত তাদের ভেতরে ভেতরে একটা আশা ছিল যে শেষ পর্যন্ত হয়তো আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কোনো কোনো অংশ এ ব্যাপারে অগ্রসর না হওয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করবে। কিন্তু যখন দেখা গেল এ ক্ষেত্রেও তারা কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারটি ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছে তখন জামায়াত একটু অস্থির হয়ে ওঠে এবং নানাভাবে বিএনপিকে প্ররোচিত করতে থাকে রাজপথে আন্দোলন পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু তাতে বিএনপির নেতৃত্বের পরিপক্ব অংশ প্রভাবিত হয়নি বলে জামায়াতের সেই চেষ্টাও হালে পানি পাচ্ছিল না। তবে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কটিতে চিড় ধরেনি এ জন্য যে জামায়াতের পক্ষে বিএনপিকে কোনোমতেই নাগালের বাইরে ঠেলে রাখা সম্ভব নয়। কারণ জামায়াত এটুকু বোঝে, এককভাবে তাদের পক্ষে কোনো আন্দোলনই গড়ে তোলা এখন সম্ভব নয়। বিএনপির সহযোগিতা তাকে পেতেই হবে। জামায়াতের সব সময়ের চেষ্টা ছিল বিএনপিকে যত দিন সম্ভব সংসদের বাইরে রাখা। বাইরে থাকতে থাকতে একসময় বিএনপির একাংশের ভেতরে আন্দোলন করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যেটাকে জামায়াত কাজে লাগাতে সক্ষম হবে। কিন্তু সেটাও সম্ভব হচ্ছে না এখনো পর্যন্ত।

এরই মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটে গেল। পঞ্চম সংশোধনী দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল বলে গণ্য হলো। এর ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর একটা চাপও সৃষ্টি হয়ে গেল। এ ঘটনা জামায়াতকে অত্যন্ত শঙ্কিত করে ফেলে। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফোরামে এ রায়ের সমালোচনা করা হতে থাকে এবং এই প্রচারণা চালানো হতে থাকে যে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য সরকার নানা রকম চেষ্টা চালাচ্ছে।

এর পরও জামায়াত নেতৃত্বের একটা ক্ষীণ আশা ছিল, হয়তোবা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের ব্যাপারে সরকার এত কঠোর অবস্থানে না-ও যেতে পারে এবং এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহল হয়তো সরকারকে কিছুটা নিবৃত্তও করতে পারে। কিন্তু তেমন কিছু না ঘটায় তারা প্রচণ্ডভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং এ হতাশা থেকেই এককভাবে তারা সহিংস রাজনীতির মাধ্যমে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পন্থা অবলম্বন করে।

সবচাইতে লক্ষণীয় ব্যাপারটি হচ্ছে, তাদের এ কর্মকাণ্ডে তারা এখনো পর্যন্ত ছাত্রদল, যুবদল কিংবা বিএনপিকে সংশ্লিষ্ট করতে পারেনি। উপরন্তু বিএনপি সংসদ অধিবেশনে একবার যোগদান করায় এবং সম্পূর্ণ দলীয় ইস্যুগুলো সংসদে উত্থাপন করায় জামায়াতের হতাশার মাত্রা তীব্রতর হয়েছিল।

বিএনপিকে আন্দোলনের জন্য মাঠে নামানোর ব্যাপারে জামায়াতের আর একটি গোপন উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমানে বিএনপির দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার মতো নয়। এ অবস্থায় যদি তাকে মাঠে নামানো যায় তাহলে পুরো নেতৃত্বটি জামায়াতের কব্জার মধ্যে চলে যাবে এবং বিএনপি নির্বীর্য রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হবে। পাঠক লক্ষ করবেন, চারদলীয় জোট যখন ক্ষমতায় ছিল তখন জামায়াত দল গুছিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় এবং বিভিন্ন নির্বাচনী অঞ্চলে বিএনপিকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়ে নিজেরাই সামগ্রিক কর্তৃত্ব নিয়েছে। এমনকি ছাত্রসংগঠনের মধ্যেও ছাত্রশিবির ছাত্রদলকে কোণঠাসা করে রেখেছিল চারদলীয় জোটের পুরোটা সময় ধরেই। আরো লক্ষ করার বিষয়, তথাকথিত এক-এগারোর পর আওয়ামী লীগ-বিএনপি, ছাত্রলীগ-ছাত্রদল, যুবলীগ-যুবদল চরম নির্যাতনের শিকার হলেও জামায়াত-শিবিরের কেশাগ্রও স্পর্শ করা হয়নি। বরং তাদের ক্লিন ইমেজের তকমা পরিয়ে নির্বিবাদে সংগঠন গোছানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের এই কৌশল নতুন কিছু নয়। একাত্তরে তারা মুসলিম লীগের কাঁধে ভর করে যত রকম অপকর্ম করেছিল। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে মুসলিম লীগের মতো একটি বিশাল ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; কিন্তু পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে জামায়াতে ইসলামী। বর্তমান সময়ে বিএনপির মতো একটি বিরাট রাজনৈতিক দলকেও আমরা বিভিন্ন জায়গায় নির্বীর্য হয়ে যেতে দেখছি। চারদলীয় জোটের শাসনামলে তার উদাহরণ দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে।

একাত্তরে জামায়াতের লাঠিয়াল এবং ঢাল ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘ। আলবদর-আলশামস বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল এই ইসলামী ছাত্রসংঘের হাতে। আজ যাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং ব্যাপক গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে তাদেরও অনেকের পরিচিতি ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা হিসেবে। এখন তারাই জামায়াতের মূল কর্ণধার।

আজ শিবিরকে পথে নামানো হয়েছে সহিংস রাজনীতি করার মন্ত্রপাঠ করিয়ে। ঠিক এইভাবেই করা হয়েছিল একাত্তরে। তখন জামায়াত বুঝেছিল, পাকিস্তানকে আর বাঁচানো যাবে না, অথচ মেধাশূন্য করে ফেলো দেশটাকে। আর এখনো জামায়াত বুঝতে পেরেছে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আর এ দেশে চলবে না, অতএব সাফ করে ফেলো যারা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে। এ জন্যই তারা তালিকা বানায় একাত্তরের মতো। এ জন্যই তারা আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। এবং তারা এমন বক্তব্যও অন্যদের মাধ্যমে প্রচার করার চেষ্টা করছে যে জামায়াত যদি একবার গোপন আস্তানায় যায়, তাহলে তারা বিরাট কিছু অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

জামায়াত যে শিবিরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে তার আর একটা কারণ আছে। ছাত্রশিবিরের একাংশের মধ্যে এ ধরনের চিন্তাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল যে একাত্তরের ঘাতকদের দায়দায়িত্ব কেন নতুন প্রজন্মের ছাত্রশিবির গ্রহণ করবে? সেই অংশটি নানাভাবে চেষ্টা করেও নিজেদের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছিল না। কাজেই তাদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা দানা বাঁধছিল। জামায়াতের ধূর্ত ও কৌশলী নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি অনুধাবন করে তাদের অ্যাকশনে নামিয়ে দেয়। জামায়াতের শীর্ষ নেতার সাম্প্রতিক শিবিরবন্দনা থেকে এই তোয়াজ করার মানসিকতার আভাস পাওয়া যায়।

জামায়াত শিবির অনেক কৌশল অবলম্বন করে থাকে। এরকম একটি কৌশল আমরা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এর মুখে শুনি, তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগ নেতৃত্বের শীর্ষ স্থানেও শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে।

জামায়াতের এইসব কৌশল অবলম্বন করার আসল উদ্দেশ্য হলো, একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব তৈরি করা। তারা চেয়েছিল সেটারই সুযোগ সৃষ্টি হবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রয়াসটিও বিঘ্নিত হবে। কারণ জামায়াত আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তাটি পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারবে যে সরকার তাদের মতো 'মডারেট ইসলামিক পার্টি'র গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে জামায়াত-শিবিরের সর্বপ্রকার নৃশংসতা, বর্বরতা এবং স্বাধীনতাবিরোধী কর্মযজ্ঞ চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সুতরাং জামায়াত শিবিরের ফাঁদ হতে, সমস্ত কৌশল হতে সচেতন হতে হবে জনগণকে, সরকারকে।

লেখাটি আবেদ খান'র লেখার ছায়া অবলম্বনে।