বেশ কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সিনিয়র সিটিজেন আব্দুর রাজ্জাক (৬৩)। করোনা উপসর্গ নিয়ে গতকাল ভোরে মোহাম্মদপুর থেকে এসেছিলেন শাহবাগে একটি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করাতে।

দীর্ঘসময় লাইনে থাকলেও সিরিয়াল পাননি। অগত্যা বাসার দিকে পা বাড়ান। একটু সামনে যেতেই তার বুকে ব্যাথা ওঠে। একপর্যায়ে রাস্তায় পড়ে গিয়ে সেখানেই মারা যান এই বয়োজ্যেষ্ঠ। সন্তানদের চোখের সামনেই মৃত্যুবরণ করেণ আব্দুর রাজ্জাক। বাবার মৃত্যুতে হতভম্ব হয়ে পড়েন দুই ছেলে। কিন্তু অসহায়ের মতো ছটফট করে বাবার মৃত্যু দেখা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না। তাদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে সেখানকার পরিবেশ। বাবার মরদেহ ঢাকার জন্য সন্তানেরা এক টুকরো কাপড় খোঁজে পায়নি কোথাও। সড়কে একটি পোস্টারের ওপর রাখা হয় মরদেহ। ঘটনাটি ঘটে রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সামনে।

আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে শাহরিয়ার ইমন বলেন, বাবার দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসে সমস্যা ছিল। আর সপ্তাহখানেক ধরে সাধারণ জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা হচ্ছিলো। আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক তাকে কিছুদিন ধরে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। তারই পরামর্শে রোববার ভোরে করোনা পরীক্ষার জন্য বাবাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। লম্বা লাইন তবুও বাবাকে রেখে আমি লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপ ও গরম বাড়তে থাকে। তিন ঘণ্টা লাইনে দাড়াঁনোর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালো আর টোকন দেয়া হবে না। তাই করোনা টেস্টের নমুনা সংগ্রহ হবে না। আমরা তখন সেখান থেকে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দেই। ঠিক তখনই বাবা বুকে চাপ দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে রাস্তায় পড়ে যান। তারপর ছটফট করতে করতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। বাবা যখন সড়কে পড়ে ছটফট করছিলেন তখন তাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছিলাম। দৌঁড়ে পাশের বারডেম হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়েছিলাম কোনো সাহায্য পাইনি। বাবা মারা যাওয়ার পর মরদেহ ঢাকার জন্য এক টুকরো কাপড়ও তারা দেয়নি। অথচ পেশাগত জীবনে বাবা আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। পরে সাংবাদিক সজল মাহমুদ ভাই বারডেম থেকে কাপড় সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। মৃত দেহের নমুনা দেয়ার জন্য ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার অ্যাম্বুলেন্সও পাইনি। কেউ যেতে রাজি হয়নি। পরে শাহবাগ থানার একজন এএসআই ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স এনে দিয়েছিলেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে ইমন বলেন, "মানুষ কত নিষ্ঠুর হয়। আমরা দুইভাই বাবার মরদেহ অ্যাম্বুলেন্স তুলতে পারছিলাম না। অথচ পাশে কত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। তারা কেউ ছবি তুলছিলো, কেউ ভিডিও করছিলো। কেউ একটু সাহায্য করে নাই। পরে আরেক পথচারির সহযোগীতায় মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলেছি। চোখের সামনে বাবার মৃত্যুর দৃশ্য সারা জীবন মনে থাকবে। এমন মৃত্য যেন কারো না হয়। বাবা হয়তো স্টোক করে মারা গেছেন।"

করোনায় বাবা মারা যাওয়ার কথা না। কারণ তার করোনার উপসর্গ তেমন ছিল না। যেগুলো ছিল সেগুলো পারিবারিক চিকিৎসকের ওষুধে কমে গেছে। শুধুমাত্র মনের সন্দেহে করোনা পরীক্ষা করাতে চেয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেলে বাবার মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। রিপোর্ট আসলে করোনা কিনা সেটি জানা যাবে। সম্ভবত পুলিশের তত্ত্বাবধানে তার মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

বেঁচে থাকতে করোনা পরীক্ষার সিরিয়াল পেলেন না। জীবন দিয়েই আদায় করলেন করোনা পরীক্ষা।

এ. কে. আজাদ - বার্তা সম্পাদক