রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সহিংসতা বন্ধ না করলে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে পাকিস্তানের তালেবান গোষ্ঠী৷ এমনকি প্রয়োজনে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন এবং ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাস বন্ধের জন্যও আহ্বান জানিয়েছে তালেবান৷ 

বিদেশের কোনো বিষয়ে নজর দেওয়ার ঘটনা বিরল হলেও পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষ সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান অফ পাকিস্তান ­- টিটিপি মিয়ানমারের মুসলমান নারী-পুরুষদের বাঁচাতে হুমকি দিয়েছে৷ তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, "আমরা তোমাদের রক্তপাতের বদলা নেব৷'' টিটিপি'র মুখপাত্র এহসানুল্লাহ এহসান ঐ বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি মিয়ানমার সরকারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার এবং ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে৷ "নতুবা আমরা শুধুমাত্র মিয়ানমারের স্বার্থের উপরই আঘাত হানবো না, একইসাথে মিয়ানমারের পাকিস্তানি দোসরদের উপরেও হামলা চালাবো" বলে হুমকি দিয়েছে এহসান৷

টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন হামলার পেছনে তাদের ভূমিকার কথা দাবি করে আসছে৷ কিন্তু পাকিস্তানের বাইরে কোনো দেশে তাদের হামলা চালানোর মতো ক্ষমতা রয়েছে কি না তা নিয়ে বিশ্লেষকরা সন্দেহ পোষণ করেছেন৷ তবে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেন যে, ২০১০ সালে নিউইয়র্কের টাইমস চত্বরে ব্যর্থ বোমা হামলার পেছনে টিটিপি'র হাত ছিল বলে তারা প্রমাণ পেয়েছেন৷ ঐ হামলা প্রচেষ্টার সাথে জড়িত থাকার দায়ে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ফয়সাল শাহজাদ-এর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে৷ পাকিস্তানের তালেবান গোষ্ঠী সীমানা পেরিয়ে আরও তৎপর হতে চাইছে

এছাড়া টিটিপি'র সাবেক নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদ-এর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে অভিযোগ রয়েছে, সাত জন সিআইএ গোয়েন্দাকে খুন করার৷ ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে এসব গোয়েন্দাদের মারা হয়৷ সেখানে সিআইএ'র গোয়েন্দা ছদ্মবেশে জর্ডানের আল-কায়েদা'র এক গোয়েন্দা নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছিল৷ এর পেছনে টিটিপি'র ভূমিকা ছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন৷

সম্প্রতি মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে৷ সাম্প্রতিক সহিংসতায় অন্তত ৮০ জন প্রাণ হারিয়েছে৷ বাস্তুহারা হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা পরিবার৷ আর ঐ অঞ্চলে সহিংসতা থামাতে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে জরুরি অবস্থা জারি ছিল৷ এসময় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা থেকে অনেক বালক ও বয়স্ক পুরুষকে আটক করেছে সরকারি বাহিনী যাদের সাথে কাউকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি এবং অনেকের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল৷

অ্যামনেস্টি'র গবেষক বেনইয়ামিন সাওয়াকি বলছেন, গত জুন মাসের শুরুতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরুর পর কিছুদিন পরেই সেটা প্রশমিত হয়ে আসলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা বেড়ে চলেছে৷ অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, রোহিঙ্গাদের উপর রাখাইন সম্প্রদায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের চালানো নির্যাতন, ধর্ষণ, সম্পত্তি বিনষ্ট করা এবং অন্যায়ভাবে হত্যাকাণ্ডের ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ' রয়েছে৷ তবে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক সংস্কার বিশ্বজুড়ে সাধুবাদ পেলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারের দিকে সেখানকার রাজনীতিকদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই৷

বিগত কয়েক দশক ধরে চলমান বৈষম্যের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রবিহীন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বায় পরিণত হয়েছে৷ মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে৷ অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারও নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সেদেশে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে৷ ফলে রোহিঙ্গাদের কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই৷ এবার সেই রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে প্রতিশোধের হুমকি দিল পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী তালেবান৷